সোশ্যাল মিডিয়া ও বর্তমান প্রজন্ম

Uncategorized

একবার মার্ক জুকারবাগ কে জিজ্ঞেস করা হয়, “আপনি কি বলতে পারবেন আগের রাত্রে আপনি কোন হোটেলে ছিলেন?” প্রশ্নটি শোনার পর, মার্ক জুকারবাগ কিছুক্ষণ চুপ থাকেন। তারপর বলেন, “আমার জানিনা।”

এরপরে উনাকে আরো একটি প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা হয় যে, আপনি কি বলতে পারবেন আগের সপ্তাহে আপনি কাকে কাকে এসএমএস করেছিলেন? মার্ক জুকারবাগ বলেন, না সেটা আমি সবার সামনে বলতে পারবোনা। অর্থাৎ যে মানুষটা প্রত্যেকটা মানুষের সম্পর্কে জানে, আমরা কেউ তার সম্পর্কে জানিনা । আর উনি নিজের সম্পর্কে কাউকে বলতেও চান না।

আজ আমি আপনাদের সোশ্যাল মিডিয়ার এমন কিছু সত্য বলবো, যা আপনি আগে কখনো শোনেননি। আজকের তারিখে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন, যে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে না। আর আপনিও তার মধ্যে একজন। আর এই কারনেই আপনি হয়তো এই লিখাটি পড়ছেন।

আসলে, সোশ্যাল মিডিয়ার এপকে স্মার্টফোনের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু আপনি কি জানেন, বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য স্মার্টফোন তৈরি করা হচ্ছে। আপনি যখনই কোন অ্যাপ ইন্সটল করেন, সেই এপ এ আপনি আপনার অ্যাকাউন্ট তৈরি করেন। আর অ্যাকাউন্ট তৈরি করার সময়, আপনি আপনার পার্সোনাল ডিটেলস সেখানে দেন।
আর এই এপ আপনাকে আপনার পছন্দ বা ইন্টারেস্ট জিজ্ঞেস করে। যাতে করে আপনি যখন এই অ্যাপের মধ্যে আসবেন, আপনাকে আপনার ইন্টারেস্ট বা পছন্দের জিনিস দেখাতে পারে। আর আপনি যেনো এই অ্যাপ্লিকেশনে বেশি সময় কাটাতে পারেন। আপনি যেন বিরক্ত অনুভব না করেন। আর মাত্র দু’ মিনিটের মধ্যেই এই অ্যাপ্লিকেশন আপনার সম্পর্কে যতটা জেনে যায়, ততটা হয়তো আপনি নিজেও নিজের সম্পর্কে জানেন না।

কারণ, এই অ্যাপ্লিকেশন বুঝে নেয় যে আপনি কি দেখতে চান, আর কি দেখতে চান না। আপনি যখন কোন ভিডিও দেখেন বা কোন পোস্ট দেখেন, আর সেই পোস্টে লাইক করেন; তারপর আপনার সামনে এমন ভিডিও পোস্ট ও নিউজ আসবে যে, আপনার আর ঐ অ্যাপটা ছাড়তে ইচ্ছে করবে না। আসুন, আজ আমি আপনাদেরকে এর পিছনের রহস্যটা বলব, এই সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপ্লিকেশনগুলো কেনো এতো অ্যাডিক্টেড? আর এটা আমাদের জন্য কেনো বিপদজনক।

আসলে যারা এই সোশ্যাল মিডিয়া এপস গুলোকে ডিজাইন করে, তারা এমন লোক যারা মানুষের ব্রেইনকে খুব ভালোভাবে রিসার্চ করেছে।

এরা জানে যে, মানুষের ব্রেইন কিভাবে কাজ করে। আর সেটাকেই তারা কাজে লাগিয়েছে। মানুষের ব্রেনের একটি অভ্যাস আছে, আর সেটা হচ্ছে প্রশংসা শোনা।


কারন প্রতিটা মানুষই নিজের প্রশংসা শুনলে খুশি হয়। আর রিয়েল লাইফে তো আমাদেরকে কেউ প্রশংসা করেনা। এই কারণে লোক সোশ্যাল মিডিয়াতে নিজের ফটো, লিখা পোস্ট করে প্রশংসা পাবার জন্য। আজ মানুষ এই সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রশংসা শোনার জন্য অনেক পরিশ্রম করে।

আর যখন এই সোশ্যাল মিডিয়া থেকে একবার প্রশংসা পাওয়া শুরু হয়ে যায়, তখনই প্রশংসা বার বার পাবার জন্য সে আরো বেশি বেশি পোস্ট করা শুরু করে। আর তারপরে সে বারবার লাইক ও কমেন্ট চেক করতে থাকে কেবলমাত্র নিজের প্রশংসা শোনার জন্য। এই পর্যন্ত সবকিছু ঠিক ছিল। আমরা আমাদের ভিডিও শেয়ার করছি এবং ফটো শেয়ার করছি। অন্যরা আমাদের ভিডিও দেখছে ও সেটাকে পছন্দ করছে আর আমাদের প্রশংসা করছে। এগুলো ঠিক আছে, কিন্তু এখানে একটা ঝামেলা আছে….

আমি আপনাদের আগেই বললাম যে, মানুষের ব্রেনের একটা অভ্যাস আছে যে প্রশংসা শোনার। একই সাথে আমাদের ব্রেনের আরও একটা অভ্যাস আছে, সেটা হচ্ছে কম্পেয়ার করা। অর্থাৎ তুলনা করা। মনে করেন আপনি কোনো ফটো আপলোড করলেন। আপনি সেই ফটোটাতে অনেক প্রশংসা ও পাচ্ছেন ।


কিন্তু যে প্রশংসা করছে সে আপনার প্রশংসা করার সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে আপনার সঙ্গে কম্পেয়ার করছে। একই ভাবে যখনই আপনি কারো ফটো দেখছেন, আপনিও সামনের জনের সঙ্গে নিজেকে কম্পেয়ার করা শুরু করেন। আর এই কারণেই অনেক লোক চেষ্টা করছে নিজের ফটোকে সামনের জনের থেকে আরও বেশি সুন্দর করতে। আসলে এটাও আসল সমস্যা নয়।

আসল প্রবলেমটা হলো, মানুষ নিজের রিয়েল লাইফে সেড আছে, কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়াতে নিজের হ্যাপি লাইফ শো করছে। আর এটা দেখেই সামনের লোকটার মনে হচ্ছে যে, এই মানুষটা অনেক খুশিতে আছে আর আমি অনেক দুঃখে আছি। আর এটা আজ প্রত্যেকটা মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। আর এই সবকিছু আমাদের ভুল নয়, কারণ প্রশংসা শোনা এবং নিজেকে কম্পেয়ার করা, এটা আমাদের ব্রেনের অভ্যেস। আর আমাদের এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়েই, সমস্ত সোশ্যাল মিডিয়ায় অ্যাপগুলোকে তৈরি করা হয়।

আপনি কখনো ভেবে দেখেছেন, যে সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপ গুলো এমনটা কেন করছে?

এদের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো যে, আপনি এদের অ্যাপ্লিকেশনে বেশি বেশি সময় কাটাবেন। এই এপস কোম্পানিগুলো চায় যে, আপনি ২৪ ঘন্টা এদের এপ এর মধ্যেই থাকবেন।


আর আমাদেরকে তারা বিনোদনের নাম করে এই সোশ্যাল মিডিয়ার নেশা করাচ্ছে। আপনারা ক্যাসিনোর নাম তো সবাই শুনেছেন। আর যদি না শুনে থাকেন, তাহলে জেনে রাখুন, এটা একটি জুয়ার মতো গেম। আর এটা অনেক অ্যাডিক্টেড একটি গেম। আর যেভাবে ক্যাসিনো গেমকে ডিজাইন করা হয়েছে, একইভাবে সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যাপগুলোকেও ডিজাইন করা হয়েছে।

আজ আমরা অন্য মানুষের মিথ্যা লাইফ দেখে, আমরা আমাদের নিজের রিয়েল লাইফের সঙ্গে কম্পেয়ার করে দুঃখী হচ্ছি। অন্য মানুষের ফেইক লাইফ দেখে, আমরা আমাদের অরিজিনাল লাইফকে বেকার মনে করছি। আর এই কারণে আমার অনেক খারাপ ফিল করছি। এই কারণেই আমরা আমাদের এত সুন্দর জীবনটাকেও বেকার মনে করছি।

হতে পারে আপনি সোশ্যাল মিডিয়াতে যাকে দেখে ভাবছেন তার জীবনটা অনেক সুন্দর, কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে তার জীবনটা আপনার থেকেও খারাপ। আপনি তার সম্পর্কে কোন কিছুই জানেন না। কিন্তু তার ঐ ফেইক লাইফ দেখে, আপনি নিজের রিয়েল লাইফের সঙ্গে কম্পেয়ার করছেন। আর আপনি নিজেকে খারাপ ভাবছেন।

আমরা প্রত্যেকেই একটি হাসতে থাকা ফটোর সঙ্গে, একটি দুঃখী মানুষ হয়ে গেছি। আমাদের নিজের জন্য বাঁচা উচিত। অন্যের জন্য নয়। অন্যজন যেমনটা চায় আমাদের তেমনটা হওয়া উচিত নয়।

বরং আমরা যেমনটা হলে খুশি হব, আমাদের তেমনটাই হওয়া দরকার। ফেইক নয়, রিয়েল হওয়া শিখুন। আর সোশ্যাল মিডিয়াতে কম এবং রিয়েল লাইফে বেশি খুশি থাকা শিখুন। রিয়েল লাইফে মানুষের সঙ্গে সংযুক্ত হোন, সোশাল লাইফে নয়।

একবার আমি একটি অনুষ্ঠান বাড়িতে গিয়েছিলাম, আর সেখানে আমি দেখি যে, ম্যাক্সিমাম লোক তারা তাদের ফোন নিয়েই ব্যস্ত আছে। আর এটা আপনাদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত ঘটছে। সামনে তো সবাই বসে আছে, কিন্তু সবার হাতে ফোন আছে। আর আজ যদি এমন অবস্থা হয়, তাহলে ভেবে দেখুন পাঁচ-দশ বছর পরে কি হবে।

এখন হয়তো অনেকেই এটা বলবেন বা কমেন্ট করবেন যে, “ভাই, আপনি তাহলে সোশ্যাল মিডিয়া কেনো ব্যবহার করছেন?” তাহলে আমি আপনাদেরকে একটা কথাই বলতে চাই, যে আমি একজন সাধারণ লেখক ও শিক্ষার উদ্দেশ্যে ইন্টারনেটে সময় কাটাই।

আমার কাজ হলো মানুষের সামনে বাস্তবতা তুলে ধরা। পাশাপাশি শিক্ষাকে কুইজের মাধ্যমে, স্বরণ করিয়ে দেওয়া। আর সে উদ্দেশ্যেই বেশি বেশি লোকের কাছে পৌঁছানোর জন্য, আজ আমি সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করছি।

অবশেষে আমি আপনাদের একটা কথাই বলবো, “সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করুন, সোশ্যাল মিডিয়া যেনো আপনাকে ব্যবহার করতে না পারে।” সোশ্যাল মিডিয়াতে নয় রিয়েল লাইফে খুশি থাকা শিখুন। আশা করি আপনারা আমার কথাগুলো বুঝতে পেরেছেন। লিখাটি ভালো বা খারাপ লেগে থাকলে, জানাবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.