সাবমেরিনে নৌসেনাদের জীবন

বাংলাদেশ

কল্পনা করুন তো , কোনো সাবমেরিন যখন পানির শত শত ফুট বা হাজার হাজার ফুট গভীরে ডুব দেয় তখন সাবমেরিনে থাকার নৌ-সেনাদের দৈনন্দিন জীবন কেমন কাটছে থাকে ?


আমরা অনেকেই ধারণা করি সাবমেরিন এর মধ্যে নৌ-সেনারা খুব স্বাচ্ছন্দেই থাকে। কিন্তু না ! জানলে অবাক হবেন যে , নৌ-সেনারা তাদের চারপাশে কোটি কোটি কিউবিক মিটার পানির মধ্যে থেকেও দিনের পর দিন গোসল করতে পারেনা বা ঠিকমত খাবার পানিটুকু পর্যন্ত পায়না । কিন্তু কেনো ?

কেনো সাবমেরিনে থাকা নৌ-সেনারা পর্যাপ্ত পরিমাণ খাবার পায় না ? কেনই বা সাবমেরিনে থাকা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং সাধারন সেনাদের একই পোশাক পরিধান করতে হয় ! এগুলো জানতে হলে আমাদের আজকের লিখাটি শেষ পর্যন্ত পড়ুন ।

সাবমেরিনের অভ্যন্তরীণ নৌ-সেনাদের দৈনন্দিন কার্যকলাপের এমন কিছু দিন সম্পর্কে আজ আমরা বলব, যা আপনি আগে কখনো পড়েননি। তো চলুন, আজকের লিখার মাধ্যমে ঘুরে আসা যাক পানির হাজার ফিট গভীরে থাকা সাবমেরিন এর ভেতর থেকে ।


নৌ-সেনাদের উপর কোনো দেশের নিরাপত্তার দায়িত্ব অর্পিত থাকে ২ টি ধাপে।
একটি পানির উপরিভাগে আর অন্যটি পানির গভীরে।

দেশের নিরাপত্তার জন্য নৌ-সেনারা পানির প্রায় ১০০০ ফিট গভীরে মাসের পর মাস কাটিয়ে থাকে । আর এই বিশেষ দায়িত্বের জন্য সৈনিকদের ইচ্ছা, লক্ষ্য, ট্রেইনিং এবং মেডিকেল কনফিডেন্ট এর উপর জোর দেয়া হয় । আর এদের মধ্যে কেবলমাত্র উৎকৃষ্ট সৈনিকদেরকেই বাছাই করা হয় । মাসের পর মাস ধরে পানির শত শত ফুট গভীরে সাবমেরিনের মধ্যে আটকে থাকা মোটেও সহজ কাজ নয়।

নৌ-সেনাদের জীবন কতটা কঠিন তা কিছুটা হলেও বুঝতে পারে সেনাদের পরিবার । নৌ-সেনারা যখন কোনো মিশনে যায় তখন তাদের পরিবারের সদস্যরা জানতেই পারে না যে তাদের প্রিয় মানুষটি কতদিনের জন্য আর কোথায় মিশনে যাচ্ছে । আর সে কবেই বা ফিরে আসবে ! নাকি আর কখনই ফিরবে না…! পরিবারের মানুষগুলো শুধুমাত্র এতোটুকুই বুঝতে পারে যে তারা দেশের সেবার জন্য নিজেদের কর্তব্য পালন করতে যাচ্ছে ।

সাবমেরিন এর মধ্যে থাকার সময় সৈনিকরা নিজেদের শারীরিক পরিচর্যা তো দূরে থাক ; ঠিকমতো গোসলই করতে পারেনা । নৌ-সেনাদের জন্য সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ এবং কঠিন কাজ হলো সাবমেরিন এর মধ্যে কোনো মিশনে দিনের পর দিন আটকে থাকা । যদিও সাবমেরিন পানির উপরে এবং গভীরে দুই জায়গাতেই পুর্নোদ্দমে চলাচল করতে পারে । তবে সমুদ্রের গভীরে থাকাকালীন সৈনিকদের অন্যতম একটি কাজ হলো জলের গভীরতা পরিমাপ করা এবং শত্রুপক্ষের উপরে নজর রাখা । বলা যায় সাবমেরিন মিসাইল বা রকেট লঞ্চারের চাইতেও মারাত্মক ভয়াবহ হয়ে ওঠে । আর তাইতো সাবমেরিন শত্রুপক্ষের জাহাজের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায় ।

সাবমেরিনে থাকা নৌ-সেনাদের উপস্থিতি কেউ বুঝতে পারে না । আর নৌ-সেনারা এই সুযোগটাই কাজে লাগিয়ে শত্রুপক্ষের ঘাঁটিতে আঘাত হেনে সবকিছু ধ্বংস করে আবার ফিরে আসে । হয়তো বা ভাবছেন এইটা বেশ সহজ কিন্তু এটা আপনার কল্পনার চাইতেও অনেক বেশি কঠিন ।

সাবমেরিনে থাকা নৌ-সেনাদের প্রায় প্রতিটি মুহুর্তেই নানা রকম সমস্যার মোকাবেলা করতে হয় । কোনো মিশন সফল করার জন্য সাবমেরিন সহ নৌ-সেনারা যখন পানির গভীরে ডুব দেয় ঠিক তখনই তারা বাইরের পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় । আর এই ধরনের ভয়ানক মিশনগুলোর সময়কাল হয়ে থাকে ১ থেকে ৬ মাস পর্যন্ত
আর এই সময়কালে কোনো নৌ-সেনা তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করার কথা চিন্তাও করতে পারে না ।
জানলে অবাক হবেন যে , শত শত ফুট জলের গভীরে ডুব দিয়ে চারপাশে প্রচুর পরিমাণ পানি থাকা সত্ত্বেও সাবমেরিনে থাকা নৌ-সেনারা দিনের পর দিন গোসল করতে পারে না । কখনো কখনো প্রায় ৩ মাসের মিশন শেষ করে সৈনিকেরা জলের উপরে এসে একবার গোসল করার সুযোগ পায় । এর কারণ হলো সাবমেরিন এর মধ্যে যথেষ্ট বিশুদ্ধ পানির অভাব । সেই সাথে প্রতিদিন একজন নৌ-সেনা মাত্র ৩ থেকে ৪ মগ পানি ব্যবহারের সুযোগ পায় ।

আর এমন কঠিন পরিস্থিতিতে সার্ভাইভ করার জন্য নৌ-সেনাদেরকে ডিসপোজেবল কোর্ট পরিধান করতে হয় । আর এগুলো ২/৩ দিন ব্যবহারের পরই সেগুলো ফেলে দিতে হয় । এই কোর্ট তৈরিতে এক বিশেষ প্রকারের কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয় । যার ফলে নৌ-সেনারা দিনের পর দিন গোসল না করলেও নানা রকম ক্ষতি রোগ-জীবাণু থেকে দূরে থাকতে পারে । তাই এই সকল নৌ-সেনারা একই ধরনের পোশাক পরিধান করে । এই ক্ষেত্রে নৌ-সেনাদের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং সাধারন সেনাদের মধ্যে কোন বিভাজন থাকে না ।

সৈনিকেরা পানির গভীরে কাটানোর সময় দিনের পর দিন সূর্য রশ্মি দেখতে পায় না । আর এমন সব প্রতিকূল পরিবেশে থাকার কারণে নৌ-সেনারা যখন ফিরে আসে তখন তারা নানারকম অসুখ-বিসুখে ভুগতে শুরু করে । বিশেষ করে পেশি এবং অস্থিগত সমস্যায় তারা ভুগে থাকে । শুধুমাত্র এতোটুকুই নয় !
সাবমেরিনে থাকাকালীন নৌ-সেনারা ঠিকভাবে খেতেও পারে না । কারণ সাবমেরিনের অভ্যন্তরে পরিবেশনকৃত খাবার গুলো যেমন- ভাত, রুটি, ডাল, তরকারি কোনোরকম মসলা ছাড়াই প্রস্তুত করা হয় । টিনের কৌটায় প্রস্তুতকৃত খাবারগুলো বহুদিন ধরে প্রিজারভ করে রাখা হয় । যার ফলে খাবারগুলো টাটকাও থাকে না । তাছাড়া খাবার তৈরীর সময় কুকদেরকে এটাও খেয়াল করতে হয়, যেন ধোয়ার পরিমাণ খুব বেশি না হয় ! আর তাই যতটা সম্ভব সাধাসিধে ভাবেই শুধুমাত্র খেয়ে সার্ভাইভ করার মতো খাবার প্রস্তুত করা হয় । যদি কোনো কারণবশত নির্দিষ্ট কোনো মিশন এর সময়কাল দীর্ঘায়িত হয় , তবে নৌ-সেনাদের সাবমেরিনে মজুদ থাকা অপর্যাপ্ত খাবার দিয়ে দীর্ঘদিনের পথ পাড়ি দিতে হয় । সাবমেরিন যখন কোনো মিশনে পানির গভীরে একবার ডুব দেয় তখন অভিজ্ঞ ডক্টর এবং প্রাথমিক মেডিক্যাল এর অনেক জিনিসপত্র সঙ্গে দেয়া হয় ।যাতে করে যদি নৌ-সেনাদের বমি বা মাথা ঘোরানোর মতো কোনো রোগ-ব্যাধি দেখা দেয় তবে যেন ট্রিটমেন্ট করা সম্ভব হয়।

শুধু এতোটুকুই নয় ! সাবমেরিনের অভ্যন্তরে প্রচুর পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র এবং জিনিসপত্র থাকার কারণে নৌ-সেনাদের ঘুমানোর জন্য পর্যাপ্ত জায়গাও থাকে না। তাছাড়া সাবমেরিন এর মধ্যে নৌ-সেনাদের ঘুমানোর জন্য নির্দিষ্ট কিছু সময় বেঁধে দেয়া হয় । মিশন চলাকালীন নৌ-সেনারা সর্বোচ্চ ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা ঘুমানোর সুযোগ পায় । বেশিরভাগ সাবমেরিনে ঘুমানোর জন্য ইঞ্জিনের সামনের দিকে দুইটি কম্পার্টমেন্ট থাকে । যদিও এখানকার তাপমাত্রা অনেক বেশি থাকে , কিন্তু সৈনিকরা বাধ্য হয়ে ঐখানেই ঘুমিয়ে পড়ে । আর এই জায়গাটিতে মিসাইল বা তারপেট এর মত ভয়ানক অস্ত্র মজুদ রাখা হয় ।

আসলে আমাদের পৃথিবীতে অনেক দেশ রয়েছে যে দেশের নৌ-সেনাদের সাবমেরিনের অভ্যন্তরে এমন কঠিন পরিস্থিতিতেই মিশন সম্পন্ন করতে হয় । যদিও অনেক দেশের সাবমেরিনের মধ্যে পর্যাপ্ত পরিমাণ সুযোগ সুবিধা থাকে । আমাদের উচিত দেশের জন্য নিবেদিত এসব প্রাণগুলোকে শ্রদ্ধা করা ।
তাদের সাহসিকতাকে আমাদের স্যালুট করা উচিত । কারণ এই সকল সেনারা আপনাকে , আমাকে রক্ষা করার জন্য বা কোনো দেশকে রক্ষার জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দিতেও দ্বিতীয়বার ভাবে না ।

তো এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন যে , ডুবোজাহাজ বা সাবমেরিনের মধ্যে কোনো মিশন চলাকালীন নৌ-সেনাদের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করা কতটা কঠিন । লিখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করতে পারেন এবং রহস্য-রোমাঞ্চ, আনকমন, ইন্টারেস্টিং, মোটিভেশন ইত্যাদি লিখা পেতে সাথেই থাকুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.