মেরাজের ঘটনা ও ইতিহাস

ইসলামিক ঘটনা

আসসালামু আলাইকুম প্রিয় ভাই-বোনেরা। আশা করি আপনারা সকলকেই আল্লাহ তায়ালা ভাল রেখেছেন।

আরবি ভাষায় মেরাজ শব্দের অর্থ হচ্ছে সিড়ি আর ফার্সি ভাষায় এর অর্থ হচ্ছে ঊর্ধ্বজগতে আরোহন।

পবিত্র কোরআনে মক্কা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত ভ্রমণকে পবিত্র ইসরা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। পবিত্র হাদীসে, বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত উপনীত হওয়া ও আরশে আজিমে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের মহিমান্বিত ঘটনাকে মিরাজ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

পরম করুণাময় সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাআলা হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর নবুয়তের ১০ম বর্ষে তার ৫০ বছর বয়সে রজব মাসের ২৬ দিবাগত রাত্রে ২৭ রজব তার পিয়ারা হাবিব হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর সঙ্গে সাক্ষাৎ ও কথাবার্তা বলার উদ্দেশ্যে জিবরাইল ফেরেশতার মাধ্যমে স্বীয়সান্নিদ্ধে উপস্থিত করেন। এরই নাম মেরাজ।

এ সম্পর্কে হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, রজব মাসের ২৬ দিবাগত রাত্রে, আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। এমন সময় জিবরাইল ও মিকাইল ফেরেশতাদ্বয় আমাকে ঘুম থেকে জাগ্রত করলেন। এরপর আমাকে জমজম কূপের নিকটে নিয়ে গেলেন এবং আমার বক্ষস্থল থেকে নাভি পর্যন্ত বিদীর্ণ করে আমার হৃদয় বের করে জমজম কূপের পানি দ্বারা উত্তমরূপে ধৌত করে পুনরায় যথাস্থানে স্থাপন করলেন। এবং তাঁর সঙ্গে ঈমান, ইলম, জ্ঞান ও হিকমত সংযোগ করে দিয়ে বক্ষস্থল সেলাই করে দিলেন। আমি স্বচক্ষে তাদের কার্যকলাপ দেখতে পেলাম কিন্তু তাতে আমার বিন্দুমাত্র কষ্ট অনুভব হলো না।
তারপর আমি অজু করে মসজিদে গিয়ে দুই রাকাত নামাজ পড়ে বাইরে এসে দেখলাম, মসজিদের দরজার সামনে একটি সাদা ধবধবে অদ্ভুত প্রাণী দাঁড়িয়ে আছে। আমি তখন ফেরেশতাকে জিজ্ঞেস করলাম, এটা কি? জিব্রাইল (আ.) তখন আমাকে বললেন, এটা আল-বোরাক। এটার উপর চেপে আপনি আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে গমন করবেন। আপনি এই বোরাকের উপর আরোহন করুন।

তখন হযরত মুহাম্মদ (সা.) কি যেন চিন্তা করতে লাগলেন এবং তার চক্ষুদ্বয় থেকে অশ্রু নির্গত হতে লাগল। এমন সময় আল্লাহর তরফ থেকে বাণী আসলো, হে জিবরাঈল! তুমি আমার পেয়ারে হাবিবকে জিজ্ঞেস করো কেন তিনি বোরাকে আরোহরণ করছেন না এবং কেন অশ্রু বিসর্জন করছেন! তখন জিবরাঈল (আ.) জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কেন বোরাকে আরোহরন করছেন না আর কেনই বা আপনি অশ্রু বিসর্জন করছেন? স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা আপনাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন এবং আপনি স্বর্গীয় বোরাকে আরোহন করে আল্লাহর সাক্ষাৎ লাভে ধন্য হয়ে গমন করতে চলেছেন। আপনার প্রতি পরম করুনাময় আল্লাহর একটি বিশেষ রহমত। যা দুনিয়ার কোন নবী ও রাসুলের ভাগ্যে জোটেনি। আজ আপনার এবং আল্লাহর মহামিলনের রাত। এতদাসত্ত্বেও আপনার ক্রন্দন করা নিতান্তই অসবর ও অস্বাভাবিক।

এবার জিবরাঈল (আ.) এর প্রশ্নের উত্তরে হযরত মুহাম্মদ (সা.) বললেন, হে জিবরাঈল! আল্লাহ তাআলা আমার জন্য বোরাক প্রেরণ করেছেন কিন্তু আমি চিন্তা করছি যে, কিয়ামতের দিন যখন আমার উম্মতগণ ক্ষুধায় পিপাসায় কাতর হয়ে উলঙ্গ অবস্থায় কবর থেকে উঠে হাশরের মাঠে গমন করবে তখন কিভাবে ৫০ হাজার বছরের রাস্তা পায়ে হেঁটে হাশরের ময়দানে উপস্থিত হবে এবং কিভাবেই বা ৩০ বছরের রাস্তা পুলসিরাত অতিক্রম করবে।

প্রিয় মুসলিম ভাই-বোনেরা, এই মহা আনন্দের সময়ও আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তার উম্মতের কথা ভুলতে পারেন নি। এজন্যই তাকে শাফিউল মুজনেবিন ওয়া রাহমাতুল্লাহ আলামিন এই মহা সম্মানজনক উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে। আর আমরা তার জন্য কী করছি…!

তৎক্ষণাৎ আল্লাহর তরফ থেকে বাণী আসলো, “ইয়াও মা নাসরুল মুত্তাকিনা ইলার রহমানি ওয়াফদাহ” (সূরা মারইয়াম, আয়াত নং ৮৫)। অর্থাৎ “হে নবী! আপনি নিশ্চিত হন। আল্লাহ ভীরু ও আপনার উম্মতিগণকে কিয়ামতের দিন এরূপ স্বর্গীয় অশ্ব প্রদান করা হবে। তারা তথায় মেহমানদের ন্যায় সমাদর ও অভিনন্দন লাভ করবে এবং বোরাকে আরোহন করে তারা পুলসিরাত অতিক্রম করবে। আল্লাহ তায়ালার এই প্রতিশ্রুতি শ্রবণ করে হযরত মুহাম্মদ (সা.) অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে আরোহণ করতে উদ্যত হলেন।

কিন্তু বোরাক অত্যন্ত লম্ফঝম্প ও ছোটাছুটি করতে আরম্ভ করল। তখন জিবরাঈল (আ.) বললেন, তুমি কি জানো না আল্লাহর পেয়ারা হাবিব তোমার পিঠে আরোহণ করতে উদ্যত হয়েছেন? কেন তুমি এত বেয়াদবি করছো?

এরপর বোরাক শান্ত হলো। তখন হযরত মুহাম্মদ (সা.) আরোহণ করলেন। তার ডানে ও বামে জিব্রাইল ও মিকাইল ফেরেশতাদ্বয় এবং আগে ও পিছে আরো ৭০ হাজার ফেরেশতাসহ হযরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে রওনা হলেন। বোরাকের গতি এত দ্রুত যে বিদ্যুতের প্রতি তার তুলনায় তুচ্ছ বলে মনে হয়। হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, বোরাক এত অধিক দ্রুতগতিসম্পন্ন যে সামনে যতদূর পর্যন্ত তার দৃষ্টি চলে ততদূর সে এক পদক্ষেপ অতিক্রম করে। আমি তার পেটে আরোহণ করার পর এত দ্রুত গতিতে চলছিল যে, চতুর্দিকের দৃশ্যসমূহ দর্শন করার শক্তি আমার সম্পূর্ণরূপে তিরোহিত হয়ে গেছিল।


বোরাকের পরিচয় সম্পর্কে ওলামায়ে কেরাম বর্ণনা করেছেন, তার মুখমন্ডল মানুষের মত, পাগুলো ঘোড়ার মত এবং উটপাখির মত বিরাট দুটি পাখা আছে। পক্ষর পালক গুলো জোহর নির্মিত এবং দেখতে অতি মনোরম। জন্তুটি ঘোড়া অপেক্ষা ছোট এবং খচ্চর অপেক্ষা বড়। তার মুখমন্ডল শুভ্র, চোখ দুটো বড় বড় এবং কালো বর্ণের কান দুটি ছিল অতিশয় চিকন এবং ঘাড় ছিল মণিমুক্তায় খচিত।

হযরত মুহাম্মদ (সা.) বোরাকে আরোহণ করা মাত্র বিদ্যুতের গতিতে সেটা ছুটে চলছিল। কিছুদূর অগ্রসর হবার পর হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর বোরাক একটি বিরাট খেজুরের বাগানের ভেতর দিয়ে গমন করতে লাগল। জিবরাঈল (আ.) বললেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমি বোরাককে থামাচ্ছি। আপনি এখানে অবতরণ করে দুই রাকাত নামাজ আদায় করুন। বোরাক যখন থামল তখন হযরত মুহাম্মদ (সা.) অবতরণ করে দু’রাকাত নামায আদায় করলেন।

তারপর জিবরাইল ফেরেশতা তাকে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি জানেন এটা কোন স্থান? এটাই সেই পবিত্র ভূমি মদিনা। কাফেরদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে আপনি মক্কা থেকে হিজরত করবেন এটাই সেই স্থান।

এরপর হযরত মুহাম্মদ (সা.) আরো কিছুদূর অগ্রসর হয়ে তিনি মিশরে উপস্থিত হলেন। এক স্থান জিবরাঈল (আ.) বোরককে থামিয়ে বললেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ! এই স্থানে একজন মহীয়সী মহিলার কবর আছে। আপনি এখানে অবতরণ করে দুই রাকাত নামায আদায় করুন। তখন হযরত মুহাম্মদ (সা.) সেখানে অবতরণ করে দু’রাকাত নামায আদায় করলেন।

তারপর হযরত মুহাম্মদ (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, হে ভাই জিবরাঈল! এই স্থানটির নাম কি? আর এই স্থানে যেন কিসের একটা অপূর্ব সুগন্ধি পাচ্ছি। এটা কিসের সুগন্ধি? জিব্রাইল (আ.) উত্তরে বললেন, ইয়া রসুলাল্লাহ! এই স্থানের নাম মাদায়েন। এখানে হযরত শোয়াইব (আ.) এর জন্ম হবার স্থান। এখানে মহাপাপী ফেরাউনের স্ত্রী পরমা পুণ্যবতী বিবি আছিয়ার কবর আছে এবং সেই কবর থেকে আপনি বেহেশতের সুগন্ধি পাচ্ছেন।

সেখান থেকে রওনা হয়ে আরো কিছুদূর গমন করার পর জিবরাঈল (আ.) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এখানে অবতরণ করে দু’রাকাত নামায আদায় করুন। কারণ এখানে হযরত মুসা (আ.) এর আল্লাহর সঙ্গে কথোপকথন হয়েছিল। এটাই তো তুরে সিনা। হযরত মুহাম্মদ (সা.) সেখানে অবতরণ করে দু’রাকাত নামায আদায় করলেন এবং সামনের দিকে এগিয়ে গেলেন।

কিছুদূর গমন করার পর হযরত মুহাম্মদ (সা.) মূল্যবান পোশাক পরিচ্ছেদে সুসজ্জিত একজন পরম সুন্দর যুবককে দেখতে পেলেন। যুবকটির শরীর থেকে এক অপূর্ব সুগন্ধি নির্গত হয়ে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ছিল। যুবকটি অত্যন্ত আদবের সঙ্গে হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর দিকে অগ্রসর হয়ে উনাকে সালাম করে অদৃশ্য হয়ে গেল।

যুবকটিকে দেখা মাত্রই তার প্রতি হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর স্নেহের উদ্রেগ হয়েছিল এবং অদৃশ্য হয়ে যাওয়ায় তিনি মনে ব্যাথিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, হে ভাই জিব্রাইল! এই যুবকটি কে এবং কেনই বা আমাকে সালাম জানিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেলো। জিবরাঈল (আ.) উত্তর করলেন, ইয়া রসুলাল্লাহ! যুবকটি প্রকৃতপক্ষে কোন মানুষ নয়। সেটি মানুষরুপী ইসলাম ধর্ম। আপনাকে সাদর সম্ভাষণ জানাতে এসেছিল। তার প্রতি আপনার মনে যেমন একটা স্নেহের আকর্ষণ সৃষ্টি হয়েছে, আপনার প্রকৃত উম্মতগণের মনে ইসলাম ধর্মের প্রতি সেইরূপ স্নেহের আকর্ষণ সৃষ্টি হবে। এমনকি তারা ইসলামের জন্য স্বীয় জান মান-ইজ্জত উৎসর্গ করতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত হবে না।

তারপর আবার কিছুদূর অগ্রসর হবার পর জিবরাঈল (আ.) বললেন, আপনি এখানে অবতরণ করে আরো দু’রাকাত নামাজ আদায় করুন। এখানে হযরত ঈসা (আ.) ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন। হযরত মুহাম্মদ (সা.) সেখানে অবতরণ করে দু’রাকাত নামাজ পড়ে পুনরায় রওনা দিলেন।

কিছুদূর অগ্রসর হবার পর হযরত মুহাম্মদ (সা.) বায়তুল মুকাদ্দাসে পৌঁছাল। সেখানে অগণিত ফেরেশতা তাকে আসসালামু আলাইকুম ইয়া নাবিউল আউয়ালিন ওয়াল আখেরিন এই বলে সালাম জানালেন। তারপর যাবতীয় নবী ও রাসূলের রুহ সেখানে অবতীর্ণ হয়ে তাকে সালাম জানালেন। বায়তুল মুকাদ্দাস মসজিদ এর নিকট উপস্থিত হয়ে হযরত মুহাম্মদ (সা.) জিবরাইল ফেরেশতার সঙ্গে অবতরণ করে মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করলেন।

ভেতরে প্রবেশ করা মাত্র তিনি সেখানে বিরাট এক জমায়েত গণ্য-মান্য ব্যক্তির সমাবেশ দেখতে পেলেন। আর সেখানে একজন পরম সুন্দর ও সর্বাপেক্ষা সুদীর্ঘ ব্যক্তিটির প্রতি তিনি অবাক হয়ে কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর তিনি জিবরাইল ফেরেশতাকে জিজ্ঞেস করলেন, এই সুদীর্ঘ সুন্দর সুঠাম সম্মানিত মহাপুরুষটি কে?

জিবরাঈল (আ.) উত্তর করলেন, তিনি মানব জাতির আদি পিতা হযরত আদম (আ.)। মানব জাতিকে সৃষ্টি করার স্বাদ হলে সর্বশক্তিমান আল্লাহ তায়ালা সর্বপ্রথমে স্বীয় কুদরতির হস্ত দ্বারা একেই সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি একদিকে যেমন মানব জাতির আদি পিতা অপরদিকে যাবতীয় নবীগণের মধ্যে প্রথম নবী। ইয়া রাসুলুল্লাহ! আপনি তাকে সালাম নিন।

হুজুর পাক (সা.) তাকে সালাম দিলেন। হযরত আদম (আ.) তখন সালামের জবাব দিয়ে বললেন, আমার পুণ্যবান সন্তান এবং মহান নবীর প্রতি জানাই খোশ আমদেদ।

এক বর্ণনায় দেখা যায়, প্রথম আসমানে হুজুর পাক (সা.) উপবিষ্ট একজন লোককে দেখলেন। তার ডানদিকে বহু মনুষ্যমূর্তি এবং বাম দিকেও বহু মনুষ্যমূর্তি। লোকটি যখন ডান দিকে তাকান তখন হেসে উঠেন। আবার যখন বাম দিকে তাকান তখন দুঃখে কেঁদে উঠেন। হুজুর পাক (সা.) এদের পরিচয় ও তার দুই দিকের লোকের তাৎপর্য জিজ্ঞেস করলেন। জিবরাঈল (আ.) বললেন, এই লোক হলো আপনার আদি পিতা হযরত আদম (আ.) এবং তার ডান ও বাম এর লোকগুলো তার সন্তানদের আকার আকৃতি। ডান দিকের আত্মাসমুহ বেহেশতী এবং বাম দিকের আত্মাসমূহকে দোজগী। তিনি ডান দিকে তাকালে হেসে ওঠেন এবং বাম দিকে তাকালে কেঁদে ওঠেন।

প্রথম আসমান থেকে রওনা দিয়ে বোরাক যখন হুজুর পাক (সা.) কে নিয়ে দ্বিতীয় আসমানে গিয়ে পৌঁছালো, জিবরাঈল (আ.) তখন হুজুর পাক (সা.) এর পরিচয় দিয়ে আসমানের দরজা খুলে দিলেন। তার প্রহরী ফেরেশতাগণ হুজুর পাক (সা.) কে খোশ আমদেদ জানান।

দ্বিতীয় আসমানে গিয়ে পৌঁছালে হযরত মুহাম্মদ (সা.) তখন হযরত ইয়াহিয়া (আ.) এবং ঈসা (আ.) কে দেখতে পেলেন। জিব্রাইল (আ.) তখন তাদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে হুজুর পাক (সা.) কে বললেন, এদের সালাম দিন। তিনি সালাম দিলেন এবং তারাও সালামের জবাব দিয়ে বললেন, আমাদের পূণ্যবান ভাই ও মহান অধিপতি খোশ আমদেদ।

এরপর হুজুর পাক (সা.) ও জিবরাঈল সহ বোরাকের মাধ্যমে তৃতীয় আসমানে পৌঁছলেন। সেখানে দরজা খোলার পর তার প্রহরী ফেরেশতাগণ হুজুর পাক (সা.) কে খোশ আমদেদ জানালেন।

হুজুর পাক (সা.) তখন ইউসুফ (আ.) কে দেখতে পেলেন। জিব্রাইল (আ.) তখন তার পরিচয় করিয়ে দিয়ে হুজুর পাক (সা.) কে বললেন, সালাম দিন। হুজুর পাক (সা.) তাকে সালাম জানালেন। এবং ইউসুফ (আ.) ও সালামের জবাব দিয়ে বললেন, আমার পূণ্যবান ভ্রাতা ও মহান নবীর প্রতি খোশ আমদেদ জ্ঞাপন করছি।

তৃতীয় আসমান থেকে হুজুর পাক (সা.) চতুর্থ আসমানে গিয়ে পৌঁছলেন। সেখানেও প্রহরী ফেরেশতাগণ হুজুর পাকের পরিচয় পেয়ে উনাকে সাদর অভ্যর্থনা জানালেন। সেখানে হুজুর পাক (সা.) হযরত ইদ্রিস (আ.) কে দেখলেন। এবং জিব্রাইলের কাছে পরিচয় জেনে তাকে সালাম জানালেন। ইদ্রিস (আ.) তখন সালামের জবাব দিয়ে উনাকে এই বলে সাদর অভ্যর্থনা জানালেন, আমাদের উত্তম ভ্রাতা এবং মহান নবীর প্রতি মারহাবা।

চতুর্থ আসমান থেকে হুজুর পাক (সা.) একইভাবে পঞ্চম আসমানে পৌঁছালেন এবং সেখানেও একই রূপে সম্ভর্থনা লাভ করলেন। পঞ্চম স্থানে হুজুর পাক (সা.) হযরত হারুন (আ.) কে দেখলেন ও তাকে সালাম দিলেন। হারুন (আ.) তাকে সালামের জবাব দিয়ে হুজুর পাক (সা.) কে সেরা রসূল ও মহান নবীর প্রতি খোশ আমদেদ বলে উনাকে সাদর অভ্যর্থনা জানালেন।

এরপর পঞ্চম আসমান থেকে হুজুর পাক (সা.) ষষ্ঠ আসমানে যথারীতি পৌঁছালেন এবং সেখানে একইভাবে দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলেন। এবং একইভাবে সাদর অভ্যর্থনা লাভ করলেন। সেখানে হযরত মুসা (আ.) কে দেখতে পেলেন। হযরত জিবরাঈল (আ.) মারফত তার পরিচয় লাভ করে তাকে সালাম দিলেন। তিনি সালামের জবাব দিয়ে বললেন, উত্তম ভাই এবং মহানবীর প্রতি খোশ আমদেদ জানাচ্ছি।

হযরত মুসা (আ.) হুজুর পাক (সা.) কে অভ্যর্থনা জানিয়ে কাদতে লাগলেন। হুজুর পাক (সা.) তাকে কাদবার কারণ জিজ্ঞাসা করলে হযরত মুসা (আ.) বললেন যে আমার কাদবার কারণ হলো আমার পরে এমন একজন নবী বানিয়ে প্রেরণ করা হলো যার বেহেশতবাসির উম্মতের সংখ্যা আমার বেহেস্তবাসির উম্মতের সংখ্যা থেকে অনেক বেশি। কেননা সেই নবীর অর্থাৎ আপনার উম্মতগণ যেভাবে আপনার অনুসরণ ও অনুকরণ করবে আমার উম্মতগণ সেভাবে আমার অনুসরণ ও অনুকরণ করে নি। ফলে আমার উম্মতগ্ণ বেহেস্তে লাভ থেকে বঞ্চিত থাকবে। আপনাকে দেখে আমার সেই কথাটি মনে পড়েছে বলে আমি কাঁদছি।

তারপর ষষ্ঠ আসমান থেকে হুজুর পাক (সা.) জিব্রাইল সহ সপ্তম আসমানের দরজায় গিয়ে উপস্থিত হলেন এবং জিব্রাইল তখন হুজুর পাক (সা.) এর পরিচয় দিয়ে ফেরেশতাদের দ্বারা আসমানের দরজা খুললেন। তারা তখন হুজুর পাক (সা.) কে সাদর অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করলো এবং তার সম্মান প্রদর্শন করলেন। সপ্তম আসমানে ছিলেন হযরত ইব্রাহিম (আ.)। জিব্রাইল (আ.) তার পরিচয় করিয়ে দিয়ে হুজুর পাক (সা.) কে সসম্মানে সালাম করলেন। তিনিও তার জবাব প্রদান করলেন এই বলে, পূণ্যবান পুত্র ও পূণ্যবান নবীর প্রতি আমার পক্ষ থেকে অভ্যর্থনা জানাচ্ছি।

সপ্তম আসমানে পর হুজুর পাক (সা.) কে সিদরাতুল মুনতাহার দিকে নিয়ে রওনা করা হল। সেখানে পৌঁছে দেখা গেল সিদরা বৃক্ষের ফল এক একটি বৃহৎ মটকার মত এবং তার পাতা হাতির কানের মত বড়।

জিব্রাইল (আ.) বলল, হে আল্লাহর রাসূল! ইহাই সিদরাতুল মুনতাহা অর্থাৎ শেষ সীমানার বৃক্ষ। আরও দেখা গেল, সিদরাতুল মুনতাহা থেকে চারটি নহর নির্গত হয়েছে। দুইটি নহর প্রকাশ্য এবং দুইটি অপ্রকাশ্য। হুজুর পাক (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, হে জিবরাঈল! এইগুলো কি? তিনি বললেন, অপ্রকাশ্য নহর দুটি হলো বেহেস্তের প্রবাহিত দুটি ঝর্ণাধারা আর প্রকাশ্য নহর দুটি হল মিশরের নীলনদ ও বাগদাদের ফোরাত নদী।

এরপর বাইতুল মামুর ঘরটি হুজুর পাক (সা.) এর সামনে পেশ করা হলো। তারপর হুজুর পাক (সা.) এর সামনে আনা হলো একপাত্র মদ এবং একপাত্র দুধ। সেখান থেকে হুজুর পাক (সা.) দুধ গ্রহণ করলেন এবং সেটি পান করলেন। তখন জিবরাঈল (আ.) বললেন, ইসলাম ধর্মের অনুসারীদের জন্য এটাই নিদর্শন। সপ্তাকাশ সিদরাতুল মুনতাহা প্রভৃতি দর্শন ও ভ্রমণের পর জিব্রাইলের মাধ্যমে হুজুর পাক (সা.) আসমানের অধিবাসী এবং বিভিন্ন ফেরেশতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ পরিচয় লাভ এবং আলাপ আলোচনা করলেন। পরে জিবরাইল তাকে বেহেস্ত ও দোযখ দেখালেন। বেহেশতের নিয়ামত সমূহ কি নেক কাজ করার ফলে লাভ করা যায় জিব্রাইল সেসব বিষয়ও হুজুর পাক (সা.) কে প্রত্যক্ষ ভাবে দেখালেন। তারপর দোজখের কিছু দৃশ্য এবং তার ভয়াবহ আযাবের কারণ গুলোও তাকে দেখানো হল। কোন পাপের জন্য কোন ধরনের আজাব হবে তার প্রত্যক্ষ দৃশ্য তাকে দেখানো হলো।

তারপর জিব্রাইল (আ.) হুজুর পাক (সা.) কে নিয়ে পুনরায় ঊর্ধ্বাভিমুখী আরোহণ করতে লাগলেন।কিন্তু কিছুদুর যাবার পরে ফেরেশতা জিব্রাইল তখন হুজুর পাক (সা.) কে বললেন, হে আল্লাহর নবী! আমার আর সামনে যাবার শক্তি নাই। আমার ও আপনার বাহন বোরাকের শক্তি ও সামর্থ্য এই পর্যন্ত শেষ। অতএব আমাদের উভয়কে এখন আপনার কাছ থেকে বিদায় গ্রহণ করতে হবে।


এই প্রসঙ্গে হুজুর পাক (সা.) এর একটি হাদীস বর্ণিত আছে, যেখানে হুজুর পাক (সা.) জিব্রাইল কে বললেন, হে জিবরাঈল! বলুন তো এমন স্থানে এসে কোন বন্ধু তার বন্ধুকে পরিত্যাগ করতে পারে! জবাবে জিবরাঈল বললেন, আমি যদি এখান থেকে সামনের দিকে এগিয়ে যাই তাহলে নূরের প্রচন্ডতার কারণে আমি জ্বলে পুড়ে ছাড়-খার হয়ে যাব।

এসময় হুজুর পাক (সা.) এমন একটি স্থানে পৌঁছালেন যেখানে কোনরূপ শব্দ বা কোলাহলের নামমাত্র ছিল না। বরং গভীর নিস্তব্ধতা বিরাজ করছিল। হুজুর পাক (সা.) এর মনে তখন সেই অভূতপূর্ব পরিবেশ
এ দারুন ভীতি সঞ্চার হল। এমন সময় রাফরাফ নামক নতুন বাহন আগমন করল এবং হুজুর পাক (সা.) সেখানে আরোহন করে সামনের দিকে অগ্রসর হলেন এবং ওই রাফরাফ এর মাধ্যমে হুজুর পাক (সা.) আরশ পর্যন্ত পৌঁছে গেলেন।

আল্লাহর পক্ষ থেকে তখন হুজুর পাক (সা.) এর প্রতি আল্লাহ পাকের ঘনিষ্ঠ হওয়ার জন্য আহ্বান আসলো। হে প্রিয় হাবিব! আপনি আমার আরশে চলে আসুন। হুজুর পাক (সা.) সে আহ্বান শুনে নিজের জুতা মোবারক খুলতে উদ্যোগী হলেন। তখন আল্লাহ বলেন, আপনার জুতা খুলতে হবে না। আপনি জুতা পায়ে রেখে আগমন করুন।

তখন হুজুর পাক (সা.) বললেন, হে মাবুদ!হযরত মুসা (আ.) যখন আপনার দর্শন লাভের আশায় তুরে গমন করেছিলেন তখন তার প্রতি হুকুম হয়েছিল তুমি ৪০ টি রোজা আদায় করে এবং জুতা খুলে কহেতুরে আসো। কহেতুর অপেক্ষা লক্ষগুন বেশি মর্যাদা এইস্থানে।

অতএব আমি পায়ে জুতা রেখে কেমন করে এস্থানে আসব। আল্লাহ বলেন, হে প্রিয় হাবিব! মুসার প্রতি জুতা খোলার আদেশ দেয়া হয়েছিল এই জন্য যে, কহেতুরের মাটি তার পায়ে লাগিয়ে তার মর্যাদা বৃদ্ধি করেছি আর আজ আমি আপনার জুতার ধুলি লাগিয়ে আরশের মর্যাদা বৃদ্ধি করতে চাই। এরপর হুজুর পাক (সা.) তার জুতা মোবারক পায়ে রেখে আরশে মহল্লায় গিয়ে আসন গ্রহণ করলেন।

মিরাজ সম্পর্কে আজকের পর্ব হয়েছে জানাবেন, পরবর্তী পর্ব পেতে চান?

Leave a Reply

Your email address will not be published.