মহানবী সাঃ ও জিবরাঈলের সাক্ষাত

ইসলামিক ঘটনা

আসসালামু আলাইকুম প্রিয় পাঠকগণ। আশা করি সকলেই আল্লাহ ররমতে ভাল আছেন। আজ আমরা আলোচনা করতে যাচ্ছি, রাসূল (সাঃ) এর সাথে জীবরাঈল (আ.) এর সাক্ষাত নিয়ে। কীভাবে সর্বপ্রথম তাদের মধ্যে সাক্ষাত হলো? সাক্ষাতকালে কী কী ঘটেছে? আরও সব রোমাঞ্চকর তথ্য সম্পর্কে আজ বলা হবে ইনশাআল্লাহ। তাই সম্পূর্ণ লিখাটি পড়বার অনুরোধ রইল।

ফেরেশতাদের মধ্যে যিনি রাসূল (সা.) এর সব চাইতে নিকটবর্তী ছিলেন এবং যিনি সর্ববস্থায় রাসূল (সা.) কে সহযোগিতা করেছিলেন তিনি ছিলেন হযরত জিবরাঈল (আ.)।

এক বর্ণনায় রাসূল (সা.) বলেন যে, ❝প্রত্যেক নবীকে আল্লাহ তায়ালা আসমান থেকে দুই জন এবং জমিন থেকে দুই জন সাহায্যকারী নিযুক্ত করে থাকেন। আমাকে দেয়া আকাশের মধ্যে থেকে দুইজন সাহায্যকারী হলেন হযরত জিব্রাইল (আ.) এবং হযরত মিকাইল (আ.)। আর জমিনে যে দুই জন সাহায্যকারী আল্লাহ আমাকে প্রদান করেছেন; তার মধ্য থেকে একজন হচ্ছেন হযরত আবু বকর (রা.) এবং আরেকজন হচ্ছে হযরত ওমর (রা.)।❞

আসুন শুরু করা যাক, হযরত জিবরাঈল (আ.) এবং হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর মধ্যকার প্রথম সাক্ষাৎ কেমন ছিল!

হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (সা.) যখন ছোট ছিলেন তখন তিনি অন্যান্য বাচ্চাদের সাথে একবার এক ময়দানে খেলাধুলা করছিলেন। পথিমধ্যে দুই জন ব্যাক্তি হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর কাছে আসেন এবং একজন রাসূল (সা.) কে ঝাপটে ধরে মাটিতে শুইয়ে দিলেন এবং রাসূল (সা.) এর বুক চিরে দিলেন। এই ভয়ানক দৃশ্য দেখে সেখানে উপস্থিত সকলেই নিজেদের ঘরের উদ্দেশ্যে দৌড়াতে থাকে।

তাদের মধ্য থেকে একজন এসে বিবি হালিমা কে উদ্দেশ্য করে বলে, কে যেনো আপনার সন্তান মুহাম্মদ (সা.) কে হত্যা করে ফেলেছে। এ কথা শুনে বিবি হালিমা তড়িঘড়ি করে সেখানে রওনা দেন। যখন তিনি ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছালো তখন তিনি দেখতে পান যে রাসূল (সা.) অনেক ভীত মনে সেখানে বসে আছেন। ভয় উনার উপর এমনভাবে চেপে ধরেছিল যে, ভয়ে সম্পূর্ণ চেহারা নীল হয়ে গিয়েছিল।

বিবি হালিমা রাসূল (সা.) এর কাছে এসে উনাকে জিজ্ঞেস করে, কি হয়েছিল?
তখন রাসূল (সা.) বলেন, যখন আমি খেলা করছিলাম তখন কোথা থেকে যেন দুই জন ব্যাক্তি এসে আমাকে মাটিতে শুইয়ে দিলো এবং আমার বুক চিরে সেখান থেকে আমার হৃদপিণ্ড বের করে ফেলে। অতঃপর তারা সেই হৃদপিণ্ড থেকে এক প্রকার কালো কি যেন বের করে এবং আমাকে বলে যে, এগুলো হচ্ছে সেই সমস্ত জিনিস যার মাধ্যমে একটা মানুষের অন্তরে শয়তানি ইচ্ছার জন্ম দেয়। অতঃপর সোনালী একটি পাত্রে করে আনা জমজমের পানি দিয়ে আমার হৃদপিণ্ডকে সম্পূর্ণভাবে পরিষ্কার করা হয়। এত কিছুর মাঝে আমি ছিলাম তখনো জীবিত এবং তারা কি কাজ করছিল তা আমি দেখতে পাচ্ছিলাম। অতঃপর যখন তারা তাদের কার্য সমাপ্ত করে তখন তারা আমার বুক সেলাই করে সেখান থেকে চলে যায়।

এই ঘটনার ৩৪ বছর পর যখন তিনি ৪০ বছর বয়সে পদার্পণ করে তখন হযরত আয়েশা (রা.) বলেন যে, তিনি অনেক ভালো স্বপ্ন দেখে থাকেন যা পরবর্তীতে দিবালোকের ন্যায় সত্য হয়ে থাকে। এমন স্বপ্ন রাসূল (সা.) একাধারে ৬ মাস দেখতে লাগলেন। তিনি উপলব্ধি করতে লাগলেন যে, শীঘ্রই কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। এটাই ছিল রাসূল (সা.) এর গুহায় একাকীভাবে এবাদতে মগ্ন হবার একমাত্র কারণ এরপর থেকে তিনি প্রায় হেরা গুহায় গিয়ে ইবাদতে মগ্ন হতে থাকেন।

রাসূলের স্ত্রী হযরত খাদিজা (রা.) বুঝতে পারলেন যে, রাসূল (সা.) সাথে নিশ্চয়ই কিছু ঘটছে। কেউ একজন রাসূল (সা.) কে পথ দেখাচ্ছেন। কোনো এক সৃষ্টি রাসূল (সা.) এর সাথে যোগাযোগ করছে।

হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, এরপর রাসূল (সা.) এর নির্জনতাকে অনেক প্রিয় করে দেন। হঠাৎ করে তিনি একাকী থাকতে অত্যন্ত পছন্দ করা শুরু করলো। এরপর অনেক লম্বা সময় ধরে রাসূল (সা.) হেরা গুহায় অবস্থান করা শুরু করলেন। প্রথমে দিনের পর দিন, তারপর সপ্তাহ, অতঃপর সম্পূর্ণ মাস তিনি সেখানেই অতিবাহিত করতে লাগলেন। এবং হযরত ইবরাহীম (আ.) এর সময়কার ইবাদত-বন্দেগির যে রীতি-রেওয়াজ ছিল তিনি সেই রীতিতে আল্লাহর সমীপে ইবাদত-বন্দেগী করা শুরু করলেন। কারণ তখনো নামাজের কোনো রীতি-রেওয়াজ ছিল না।

একদিন হঠাৎ করে তিনি উনার গুহার সদরে হযরত জিবরাঈল (আ.) কে মানবাকৃতিতে দেখতে পান। অতঃপর উনার সাথে সেখানে যা ঘটে তিনি সেটা হযরত খাদিজা (রা.) কাছে এভাবে বর্ণনা করেন, “যাকে আমি ৬ মাস স্বপ্নে দেখেছিলাম সেই ব্যক্তিকে আমি গুহার বাহিরে দাঁড়ানো অবস্থায় দেখতে পাই।”

এর থেকে আমরা বুঝতে পারলাম যে, রাসূল (সা.) স্বপ্নে হযরত জিবরাঈল (আ.) কে দেখেছিলেন।

তখন তিনি ভাবতে থাকেন, কী আশ্চর্য! আমিতো এখনো ঘুমের মধ্যে নয়, তাহলে আমি বাস্তবিকভাবে এই ব্যক্তিকে কিভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি?

তিনি বুঝতে পারেন যে, এটা কোনো স্বপ্ন নয় এটা সম্পূর্ণভাবে বাস্তব। যখন মানবাকৃতিতে ঢাকা হযরত জিবরাঈল (আ.) এর কাছে আসেন এবং উনি যে বাস্তব সেটা বুঝানোর জন্য রাসূল (সা.) কে অনেক জোরে জড়িয়ে ধরে এবং উনাকে উদ্দেশ্য করে বলেন যে, পড়ুন (ইকরা)।

রাসূল (সা.) তার জবাবে বলেন যে, আমি পড়তে পারিনা। জিব্রাইল (আ.) আবার রাসূল (সা.) কে সজোরে জড়িয়ে ধরে ছেড়ে দিলেন এবং বললেন, পড়ুন।

তখন রাসূল (সা.) জবাবে বলেন যে, আমি পড়তে জানি না। অতঃপর তেমনি ভাবে হযরত জিব্রাইল (আ.) রাসূল (সা.) কে জড়িয়ে ধরে বলেন, পড়ুন।

তখন জবাবে রাসূল (সা.) বলেন যে, আমি কি পড়বো?

তখন হযরত জিব্রাইল (আ.) রাসূল (সা.) কে বলেন, পড়ুন আপনার প্রভুর নামে যিনি আপনাকে সৃষ্টি করেছেন। যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন পানির মাধ্যমে। পাঠ করুন আপনার প্রভুর নামে, যিনি পালনকর্তা। পাঠ করুন আপনার প্রভুর নামে, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন।

এক বর্ণনায় রাসূল (সা.) বলেন, “জিব্রাইল (আ.) আমাকে এত জোরে জড়িয়ে ধরেছিল তখন আমার মনে হচ্ছিল যেন, আমি সেখানেই মৃত্যুবরণ করবো। কিন্তু যখন আমি জিব্রাইল (আ.) এর কথা মতো তা পড়তে থাকি তখন তিনি আর আমাকে জড়িয়ে ধরলেন না।”

অতঃপর রাসূল (সা.) হেরা গুহা থেকে ঘরে ফিরে এলেন। হযরত খাদিজা (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে আপনার? তখন রাসূল (সা.) ভয়ার্ত কণ্ঠে বলেন যে, আমাকে তাড়াতাড়ি কম্বল দিয়ে ঢেকে দাও। তখন রাসূল (সা.) এর কথা মতো হযরত খাদিজা (রা.) সেটাই করলেন।

অতঃপর যখন রাসূল (সা.) কিছুটা শান্ত হলেন এবং তখন তিনি হযরত খাদিজা (রা.) কে সমস্ত ঘটনা খুলে বললেন।

একথা শুনে হযরত খাদিজা (রা.) হযরত (সা.) কে আশ্বস্ত করে বলেন যে, সে মহান সত্তার কসম আপনাকে তিনি কখনো লজ্জিত করবেন না। কারণ আপনি তো অসহায়কে সাহায্য প্রদান করেন, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করেন, সুসম্পর্ক বজায় রাখেন, ওয়াদা রক্ষা করেন ইত্যাদি বলে হযরত খাদিজা (রা.) রাসূল (সা.) কে সান্ত্বনা দিয়ে থাকেন।

অতঃপর যখন রাসূল (সা.) আবার হেরা গুহায় যান তখন তিনি গায়েবি থেকে হযরত জিব্রাইল (আ.) এর কন্ঠ শুনতে পান। তিনি রাসূল (সা.) কে উদ্দেশ্য করে বলেন, নিশ্চয় আল্লাহ আপনাকে সত্য নবী হিসেবে প্রেরণ করেছে। একথা শুনে রাসূল (সা.) ঘরে ফিরে আসেন।

কিছুদিন পর রাসূল (সা.) আবার গায়েবি ভাবে সেই কণ্ঠটি শুনেন। সেই কণ্ঠটি বলেছিল যে, হে আল্লাহর রাসূল! আমি হচ্ছি জিবরাঈল (আ.)।

যখন এই কথাটি শুনে, রাসূল (সা.) আকাশের দিকে তাকান তখন তিনি হযরত জিবরাঈল (আ.) এর প্রকৃত রূপ দেখতে পান। দেখতে পান যে, হযরত জিবরাঈল (আ.) উনার ডানার মাধ্যমে সমস্ত আকাশকে ঢেকে ফেলেছে। এই দৃশ্য দেখে রাসূল (সা.) অত্যন্ত ভীত হয়ে যান এবং তিনি বাড়ি এসে হযরত খাদিজা (রা.) সব কথা খুলে বলেন।

সব শুনে হযরত খাদিজা (রা.) রাসূল (সা.) কে নিয়ে উনার চাচাতো ভাই ওয়ারাকার কাছে নিয়ে যান। সব কথা শুনে ওরাকা তখন হযরত খাদিজা (রা.) কে বলেন, “উনি হচ্ছেন সেই ব্যক্তি যার নিকট সেই ফেরেশতা এসেছিল; যা পূর্বে অন্যান্য নবীদের কাছে এসেছিল। উনি হচ্ছেন সেই শেষ নবী। আজ যদি আমি যুবক হতাম তাহলে আমি সব দিক থেকে উনাকে সাহায্য করতাম।”

এই ঘটনার কিছুদিন পর রাসূল (সা.) এর উপর উপর ওহী নাযিল বন্ধ থাকে। অতঃপর যখন রাসূল (সা.) কিছুটা স্বাভাবিক হন তখন ধারাবাহিকভাবে উনার উপর ওহী নাজিল হতে শুরু করে।

প্রিয় পাঠক, কেমন লাগল নবীজি (সাঃ) ও জিবরাঈলের সাক্ষাত শুনে…? আর এটিই ছিল তাদের প্রথম সাক্ষাত এবং তারপর তা নিয়মিত বিভিন্ন প্রয়োজনে চলতে থাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.