নমরুদের মৃত্যু – নমরুদ ও মশার কাহিনী

ইসলামিক ঘটনা

এই পৃথিবীতে যারা অত্যাচারী জালিম শাসক ছিল, তারা কেউই আল্লাহর গজব থেকে রক্ষা পায়নি।

যারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে অহংকার এবং দাম্ভিকতার সহিত আল্লাহ সঙ্গে চ্যালেঞ্জ করেছিল, তাদের শেষ পরিণতি পৃথিবীর ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ আছে। আর তাদের মধ্যে অন্যতম একজন নমরুদের কথা আমরা অনেকেই জানি।
যে নমরুদ, নিজেকে খোদা দাবি করেছিল। কিন্তু সেই সব পথভ্রষ্ট শাসকদের এবং কর্মের হেদায়েতের জন্য আল্লাহর তা’আলা যুগে যুগে নবি-রাসুল প্রেরণ করেছিলেন।

নমরুদের যুগে আল্লাহ তায়ালা হযরত ইব্রাহিম (আঃ) কে প্রেরণ করেছিলেন। আজ আমরা নমরূদের শেষ পরিণতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানব। আসুন শুরু করা যাক…

একদিন আল্লাহর তরফ থেকে হুকুম আসে, “হে নবি তুমি বেবিলন চলে যাও এবং নমরুদকে পুনরায় ইসলাম গ্রহণের দাও।”

হযরত ইব্রাহিম (আঃ) আল্লাহর হুকুম পেয়ে আর বিলম্ব করার কথা চিন্তা করলেন না। তাই তিনি সোজা বেবিলনের পথে রওনা দিলেন। কয়েকদিন ধরে অনেক কষ্ট করে, তারপর তিনি নমরুদ এর রাজ্যে গিয়ে পৌঁছালেন। নমরুদ ইতিমধ্যে নবীর অবর্তমানে, তার নাস্তিক সহচরদের কান কথায় নিজ খোদা-ই দাবির ক্ষেএে যথেষ্ট মজবুত হয়েছিল।

হযরত ইব্রাহিম (আঃ) যখন দ্বিতীয়বার তাঁকে দ্বীনের দাওয়াত দিতে গিয়েছিলেন, তখন তার প্রতি নমরুদ ভীষণ ক্ষীপ্ত হয়ে বলল, “ইব্রাহিম তুমি আমাকে আর বিরক্ত করো না। আমি আমার খোদা-ই দাবির ক্ষেএে অনর। তুমি অযথা সময় নষ্ট করে এখানে পুনর্বার কেন এসেছ? তুমি এবার যদি আমাকে অধিক বিরক্ত করো, তাহলে আমি তোমাকে নিজ হাতে শাস্তি দেবো।”

হযরত ইব্রাহিম (আঃ) নমরুদ এর কথা শুনে বললেন, “হে রাজা নমরুদ, তুমি যে অর্থ-সম্পদের অহংকারে নিজেকে খোদা দাবি করছো, তার সবই মহান প্রভুর দান। তিনি ইচ্ছা করলে তোমার সমস্ত ধন-সম্পদ ছিনিয়ে নিতে পারেন। এবং তোমাকে যে কোন সময় কঠিন বিপদের সম্মুখীন করতে পারেন। তার মোকাবেলা করা তোমার পক্ষে কোনদিনও সম্ভব নয়। অতএব, সমস্ত অহমিকা পরিত্যাগ করে মহান আল্লাহ তালার উপর ঈমান আনো। তিনি যদি তোমার উপর বিরক্ত হন, তাহলে তোমার শক্তি ও অর্থের দম্ভ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে। অতএব আর সময় নষ্ট করো না। তোমার জীবনের অন্তিম সময় প্রায়ই এসে গেছে। আমি তোমাকে শেষবারের মতো দ্বীনের দাওয়াত দিতে এসেছি।”

নমরুদ তখন নবীর কথা শুনে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলো এবং কর্কশ স্বরে বলল, “ইব্রাহিম তুমি ও তোমার খোদা আমার রাজ্য থেকে চলে যাও। না হয় আমার সাথে মোকাবেলা করার জন্য সম্মুখে হাজির হও।”

নবি বললেন, “হে রাজা নমরুদ, তুমি আমার মহান আল্লাহর সাথে মোকাবেলা করতে চাও? তবে প্রস্তুত হও…। কবে কোথায় এই মোকাবেলা হবে বলে দাও।”

নমরুদ বললো, “হ্যাঁ, উত্তম প্রস্তাব। আসো, সকল বোঝাপড়া চূড়ান্ত হবে যুদ্ধক্ষেত্রে।”

এই বলে নমরুদ তখন থেকে সৈন্যদের প্রস্তুতি নিতে আদেশ দিলেন।

হযরত ইব্রাহিম (আঃ) বিমর্ষ মনে সেখান থেকে নিজ আত্মীয়-স্বজনদের নিকট ফিরে এলেন। আত্মীয়-স্বজনদের কতক নবীকে আদর করলো এবং প্রান দিয়ে যত্ন করলো। আবার কতক নবীর বিরোধিতা করতেও ছাড়লো না।

নমরুদ তার বিশেষজ্ঞ সৈনিকদেরকে তিন দিনের মধ্যে ব্যাবিলনের উন্মুক্ত ময়দানে সমবেত হওয়ার জন্য নির্দেশ দিলেন। মহারাজার হুকুম অনুসারে সারাদেশে সমরসজ্জা আরম্ভ হলো। সেনাবাহিনীকে তৃপ্তি দানকল্পে মহিলা ব্যাটেলিয়ন পর্যন্ত ময়দানে হাজির হতে কসুর করল না। দু’দিনের মধ্যে ব্যাবিলনের উন্মুক্ত ময়দান সেনাছাউনিতে ভরে গেল।

১৮ শত বর্গমাইল জুড়ে, সেনাবাহিনী তাঁবু খাটালো। সেখানে সাধারণ সৈন্য, ডাক্তার ও প্রমথ বালাদের সাথে ৮ লক্ষ বর্ম পরিহিত সৈন্য মোতায়ন করা হয়েছিল। সে এক বিশাল আয়োজন। নমরুদ সেনা মোতায়েন এর কাজ সমাপ্ত করে, হযরত ইব্রাহিম আঃ কে খবর দিল। হযরত ইব্রাহিম আঃ নমরুদ এর সম্মুখীন হলেন।

তখন নমরুদ বলল, “কোথায় তোমার খোদা এবং কোথায় তার সৈন্য সামন্ত।”

হযরত ইব্রাহিম (আঃ) বললেন, “তুমি যে সামান্য প্রস্তুতি নিয়ে আমার খোদার মোকাবেলা করার জন্য অগ্রসর হয়েছো, এটা অত্যন্ত হাস্যকর। আমার খোদা ইচ্ছা করলে, ক্ষুদ্র প্রানী মশা দ্বারা তোমার এ বিশাল বাহিনী মূহুর্তের মধ্যেই খতম করে দিতে পারেন।”

নমরুদ তখন নবির কথা শুনে এক অট্টহাসি দিয়ে বললেন, “তোমার খোদার ক্ষমতা থাকে তো সম্মুখে আসতে বলো।”

হযরত ইব্রাহিম (আঃ) নমরুদ এর কথায় অগ্নিশর্মা হয়ে উঠলেন এবং বললেন, “তুই সাবধান হয়ে যা। তিন দিনের মধ্যে আল্লাহর গজব এসে তোর সমস্ত অহংকার চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিবে। এই বলে হযরত ইব্রাহিম (আঃ) সেখান থেকে দূরত্ বিদায় নিলেন।”

হযরত ইব্রাহিম (আঃ) নিজ বিশ্রামাগারে গিয়ে, ওজু করে দুই রাকাত নামাজ আদায় করলেন এবং নমরুদ কে ধ্বংসের জন্য দোয়া করলেন। নবির মোনাজাত শেষ হতে না হতেই, সেখানে হযরত জিব্রাইল (আঃ) অবতীর্ণ হয়ে হযরত ইব্রাহিম (আঃ) কে জানালেন, “আল্লাহ তায়ালা আপনার দোয়া কবুল করেছেন। আপনি গিয়ে বিশ্রাম গ্রহণ করুন এবং নমরুদকে পরশুদিন এর কথা বলে দিন।”

তখন হযরত ইব্রাহিম (আঃ), হযরত জিব্রাইল (আঃ) এর কথায় শান্ত হলেন। তারপর নমরুদকে খবর পাঠিয়ে দিলেন, যেন সে তার খোঁজ নিয়ে পরশুদিন ময়দানে উপস্থিত থাকে।

নমরুদ নবীর খবর পেয়ে তার ওজির হামান’কে ময়দানে পাঠিয়ে দিলো এবং রণসজ্জার প্রস্তুতির ক্ষেত্রে যা বাকি ছিলো তার দ্রুত সমাধান করার জন্য জোর তাগিদ দিলো। মহারাজার জরুরি নির্দেশ পেয়ে, প্রধান সেনাপতি যুদ্ধের ধরন জানার জন্য, নমরুদ এর দরবারে উপস্থিত হলো। এবং নমরুদ এর নিকট জিজ্ঞেস করলো যে, “ইব্রাহিম (আঃ) এর পক্ষে কারা যুদ্ধ করবে এবং কিভাবে সে যুদ্ধ চলবে?”

নমরুদ বলল, “বিষয়টি আমিও বিস্তারিতভাবে জানি না। তবে ইব্রাহিম এর কথা অনুসারে, যতটুকু ধারনা করছি, তাতে মনে হয় কোনো মানুষ অস্ত্র নিয়ে তোমাদের মোকাবিলা করবে না। মশা-মাছি জাতীয় কোনো প্রাণীর প্রাদুর্ভাব হতে পারে। তাই তোমারা আগামী পরশুদিন, ভোর থেকে যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে ময়দান কাপিয়ে তুলবে। যাতে করে ক্ষুদ্র প্রানীরা ভয়ে আর তোমাদের কাছে আসতে না পারে। পরবর্তী পর্যায়ে যদি এগুলা তোমাদের একেবারেই কাছে এসে যায়, তাহলে দুই হাতে চর মেরে মেরে, ওগুলোকে খতম করে দিবে। কোনো ভারী অস্ত্রের আর প্রয়োজন হবে না।” সেনাবাহিনীর প্রধান নমরুদের কথা শুনে, নিশ্চিন্ত মনে হাসি দিয়ে বিদায় হলেন।

যুদ্ধের দিন

এর মধ্যে মাঝখানে একদিন পার হয়ে গেল। যুদ্ধের দিনে ভোর থেকে নমরুদের সৈন্যরা দামামা ও যুদ্ধ বাজনা বাজিয়ে ময়দানে কাঁপিয়ে তুললো। এমন সময় দেখা গেল, আকাশে ঘন কালো মেঘ। মেঘগুলো ঘন যেন দ্রুত ঐদিকেই আসছে। আর একটু পরে দেখা গেল, ঠিকই মেঘগুলো যুদ্ধ ময়দানে ঘিরে ফেলেছে। অল্পক্ষন পরে দেখা গেল, সেনাবাহিনীর মাথার উপর মেঘমালা এসে উপস্থিত হলো। সেনাবাহিনীর লোকেরা উপরের দিকে তাকিয়ে রইল। এবার তারা পরিষ্কার দেখতে পেল যে, মেঘের আকারে তাদের মাথার উপর যে কালো ছায়া এসে পৌঁছেছে, তা হলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মশার সমষ্টি।

এ বিন্দু বিন্দু মশকের ডাকের শব্দ এতটাই প্রচন্ড ছিলো যে, নমরুদ বাহিনীর বাদ্য-বাজনার সমস্ত আওয়াজ তলিয়ে গেল। মশারা অতি দ্রুত, এক এক সৈন্যের মাথার উপর, এক একটি বসে যখন চামড়া ভেদ করে তাদের হুল ফুটিয়ে দিল, তৎক্ষণাৎ সে অজ্ঞান হয়ে পড়ল। এভাবে দশ মিনিটের মধ্যে সমস্ত ময়দানের লোকেরা ধরাশায়ী হয়ে পরলো। মশারা সৈন্যদের মাথার মগজ ও রক্ত খেয়ে শেষ করল। অতঃপর তাদের শরীরের মাংস খেতে আরম্ভ করলো। অল্প সময়ের মধ্যেই ময়দানের সমস্ত মানুষের চুল, নখ ও হাড় ছাড়া আর কিছুরই অস্তিত্ব দেখা গেল না। এবং প্রত্যেকটি ক্ষুদ্র মশা রূপান্তরিত হয়ে মুরগির মত আকৃতি ধারণ করলো।

নমরুদ দূরে বসে সমস্ত অবস্থা দেখল এবং আতঙ্কিত হয়ে ব্যাবিলনের রাজমহলে গিয়ে আশ্রয় নিল। সেখানে সে একা একা বসে ভাবতে লাগলো, অবস্থাটা কি হলো। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মশা কিভাবে সমস্ত মানুষগুলোকে নিঃশেষ করল?

এমন সময় একটি ক্ষুদ্র মশা এসে তার হাটুর উপর বসলো। সে তখন মশাটিকে দেখে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হলো এবং ভাবল, এত ক্ষুদ্র এক প্রানী আমার শক্তিশালী একেক জন সৈন্যকে কিভাবে সমূলে নিঃশেষ করে দিল?

একথা চিন্তা করে, সে যখন মশা টি কে ধরার জন্য হাত বাড়ালো, তখন মশাটি উড়ে তার নাকের ছিদ্র দিয়ে মাথার মধ্যে গিয়ে পৌছালো। তখন থেকে নমরুদের মাথার ভেতর যন্ত্রণা আরম্ভ হয়ে গেল। নমরুদ দিশেহারা হয়ে গেল। সে তখন হাত দিয়ে মাথায় আঘাত করতে আরম্ভ করলো। তাতে সে একটু স্বস্তি বোধ করল।

কিন্তু মাথায় আঘাত করা বন্ধ করে দিলে, তখন মাথার যন্ত্রণা শুরু হয়ে যায়। নমরুদ এ অবস্থায় কয়েকটি কাঠের ছোট হাতুড়ি বানালো। যা দিয়ে মাথায় আঘাত করা সহজ হয়। একদিন একরাত অতিবাহিত হবার পরে, এই কাজের জন্য একজন কর্মচারী নিয়োগ করা হলো।


সে কাঠের হাতুড়ি দ্বারা সর্বক্ষণ নমরুদের মাথায় আঘাত করতো। এতে সে মোটামুটি কিছুটা সুস্থতা বোধ করত। এভাবে নমরুদের কর্মচারী দিন-রাত তার মাথায় আঘাত করে চলেছে। আর আঘাতকারী কর্মচারীর সংখ্যা বৃদ্ধি করা হলো।

প্রত্যেককে আট ঘণ্টা করে ডিউটি ভাগ করে দেয়া হলো। দিনের পর দিন নমরুদের অবস্থা কাহিল হতে আরম্ভ করলো। সে শারীরিক ও মানসিকভাবে খুবই দুর্বল হয়ে পড়ল। এবং বিবেক বুদ্ধি অনেকটা লোপ পেল। স্বরণশক্তি অনেকটা কমে গেল। মেজাজ রুক্ষ হলো। ধৈর্য বলতে আর কিছুই বাকি থাকলো না। এমতবস্থায়, তার অনুগত ব্যক্তিবর্গরাও তার নিকট থেকে সরে গেল। এমনকি তার নিয়মিত পরিচর্যা পর্যন্ত ব্যাঘাত সৃষ্টি হল।

একদিন তার মাথায় আঘাতকারী একজন কর্মচারী, নিজ প্রয়োজনে ক্ষণিকের জন্য বাহিরে গিয়েছিল। তখন নমরুদ ক্রোধ এ অগ্নিশর্মা হয়ে ওঠে। যখন কর্মচারী ফিরে এলো, তখন নমরুদ কর্মচারীকে জুতা দিয়ে খুব প্রহার করল। এতে কর্মচারী খুব অপমান বোধ করলো। এবং সে প্রতিশোধের চিন্তায় ব্যাকুল হয়ে উঠলো।

একদিন পরে রাত্রিবেলায় যখন তার ডিউটি পড়লো। তখন সে গভীর রাতে কাঠের হাতুড়ি দ্বারা নমরুদের মাথার উপর খুব জোরে আঘাত করলো। এ আঘাতে নমরুদের মাথা ফেটে চৌচির হয়ে গেল। তখন দেখা গেল যে, তার মাথার খুলি ভেতর থেকে, একটি মশা উড়ে চলে গেল। সেই সাথে নমরুদের ইহলীলা শেষ হয়ে গেল………………।

আর এভাবেই মহান আল্লাহ তা’আলা যুগে যুগে অত্যাচারী ও অবাধ্য শাসকদের শাস্তি দিয়ে থাকেন। দেখা হবে পরবর্তী পর্বে, কোনো বিশেষ গল্প নিয়ে…….

Leave a Reply

Your email address will not be published.