তপুর জীবনের গল্প (দিনবদল)

ছোট গল্প

ছেলেটা শুয়ে আছে।
একটা বড় দোকানের সামনে। দোকানটা এখনো বন্ধ। এতো সকালে দোকান খোলারও কথা না। কেবল ভোর হলো। আবার চোখের পাতা নেমে এলো। ঘুমিয়ে পড়লো সে।

দুইদিন যাবৎ কিছুই খায়নি। এখানে ওখানে ঘুরে কোনো কাজ পাচ্ছে না৷ আসলে এই শহরে তো নতুন তপু। মানুষও কেউ পরিচিত নয়। ওর মা বাড়িতে ওর জন্য অপেক্ষা করছে৷ তপু ওর মাকে কথা দিয়ে এসেছে যে, এই করুন দশা থেকে ওদের মুক্তি দিতে সে শহরে যাবে। ওর মা প্রথমে ওকে একা আসতে দিতে চায় নি। কিন্তু পরে সংসারের কথা ভেবে রাজি হয়েছে।


“এই ছেলে, এখানে শুয়ে আছো কেন? বেলা তো নয়টা বাজে। তাছাড়া এই শহরে তোমাকে তো এর আগে দেখিনি। “

তপু দেখলো একজন মধ্যবয়সী লোক তাকে ডাকছে। চোখে চশমা। মুখটা একটা লম্বা। মানুষটার চোখে কোনে রাগ নেই। মনে হয় অনেক কাছের মানুষটা।


“ইয়ে, মানে, এখানেই ঘুমিয়ে পরেছিলাম। গতকাল আর নড়ার শক্তি ছিল না। মনে হয় দোকানটা আপনার?”

“হ্যা, আমারই দোকান। তবে তুমি কে?”

“আমাকে আপনি চিনবেন না। আমি এই শহরে নতুন। গত দুইদিন আগে এসেছি কাজের জন্য। কাজ পাই নাই। কেউ কাজ দিতে চায় না। এজন্য দুইদিন কিছু খেতেও পাই নি।”

মানুষটার মনে হয় তপুর কথা শুনে মায়া হলো।

সে বলল, “আমার সাথে এসো।”

“কোথায়?”

“এই দোকানে।”

তপু ভেতরে ঢুকলো। একটা বড় ফার্নিচারের দোকান। মনে হয় কয়েক কোটির কম হবে না।


“এখানে বসো।” এই বলে লোকটা একটা চেয়ারে বসতে বলল। সামনে টেবিল। লোকটা বাইরে চলে গেল। ফিরলো পাঁচ মিনিট পরে।

তপুর সামনে খাবার। লোকটা হোটেলে গিয়েছিল। তপুর জন্য অনেক খাবার নিয়ে এসেছে৷ তপু হাতমুখ ধুয়ে আসলো৷ এখন খাবার দেখে পেটের ক্ষিদেটা যেন আরো কয়েকগুণ বেড়ে গেল। ধন্যবাদ দেবারও সময় পেল না। খাবার খেতে শুরু করলো।

লোকটা তপুর খাওয়া দেখলো৷ তারও ভাল লাগছে। তার কোনো ছেলে নাই। তার নিজের ছেলেও কি এভাবেই খেতো!

তপুর খাওয়া শেষ হয়েছে। লোকটাকে কি বলে ধন্যবাদ দেবে ভেবে পাচ্ছে না। বিব্রতবোধ করছে৷

লোকটাই প্রথম কথা বলল, “শোনো, এবার তোমার কথা সব খুলে বলো।”

তপু বলতে শুরু করলো।


“আমরা দুই ভাইবোন। মা আর বাবা নিয়ে ছোট সংসার। বাবা রিকশা চালায়। তাতে দিন আনে দিন ফুরোয়। আমাদের পরিবারের ভরনপোষণ চালাতে বাবা হিমসিম খেতো। তবুও বাবা ছিল আমার দেয়াল। কিন্তু একদিন সব কালবৈশাখী ঝাড়ের মতো শেষ হয়ে গেল। বাবার রিকশা এক ট্রাকের ধাক্কায় দূর্ঘটনা ঘটে। আর সেখানেই সে……। “

এই বলে তপু কাঁদতে আরম্ভ করলো। তারপর কিছুক্ষণ পরে আবার বলতে লাগলো।

“ছোটবোনের মা বিয়ে দিয়ে দেয় ১৫ বছর বয়ছে। আমি রাজি ছিলাম না৷ তবুও মা শুনলো না। এখন ছোটবোনদের সাথে তেমন আমাদের যোগাযোগ নেই। কারণ বিয়ের কয়েকদিন পরেই একটা শহরে চলে গিয়েছিল।

এখন বাড়িতে শুধু আমি আর মা। সংসার আর কতদিন চলে! আমি মাকে কথা দিয়ে এসেছি এই অবস্থা থেকে আমি উদ্ধার করব। কিন্তু মনে হয় পারব না। কারণ এখনো কাজ পাই নাই।”

লোকটা মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনলো।
তারপর বলল, “বড়ই খারাপ লাগলো তোমার কথা শুনে। তুমি কাজের চেষ্টা করেছো। পড়াশোনা করেছো?”

“জ্বি, এসএসসি পর্যন্ত। এরপর আর পড়া হয় নি।”

“আমি হলাম এই শহরের একজন ব্যবসায়ী। লোকে আমাকে শাহেদ আলি নামেই চেনে। আমি তোমাকে কাজ দেব। যদি তোমার কাজের প্রতি আগ্রহ থাকে!”

তপুর চোখ ভিজে গেল। এ দুঃখের কান্না নয়। আনন্দের কান্না।
সে তাড়াতাড়ি বলল, “আমি করতে পারব। আমাকে পারতেই হবে।”

শাহেদ আলি বিকালে তপুকে বাসায় নিয়ে গেলেন। তার পরিবারের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তার এক মেয়ে। ক্লাস ফোরে পড়ে।

তপুর কাজ হলো সকাল নয়টা থেকে বিকাল পর্যন্ত শাহেদ আলির দোকানে কাজ করা৷ আর রাতে সামিয়াকে পড়ানো। সামিয়া, শাহেদ আলির ছোট মেয়ে।

শাহেদ আলির ব্যবসা এখন আগের থেকে অনেক লাভজনক হচ্ছে। ব্যাপারটা তপুর জন্যই মনে হয়।

তপু মনোযোগ দিয়ে কাজ করে৷ এই পরিবার তার আপন পরিবারের মতো৷ তার সব খেয়াল রাখে৷ খাবার খেতে দেরি হলে আন্টির রাগ শোনে। তার ভালোই লাগে। তার মাও তো এভাবে রাগ করতো৷

মায়ের কথা তপুর মনে পড়ে। সে চিঠি লিখেছিল। ৯ দিন পরে মা জবাব দিয়েছে যে, সে ভালো আছে। তার বোন কয়দিন ওখানেই আছে৷ তবুও মায়ের জন্য তপুর মনে আনচান আনচান করে।

আজ ৬ মাস হয়ে গেছে। তপু অন্যমনস্কভাবে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে। মেঘগুলো থেমে নেই। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় তুলোর মতো ভেসে যাচ্ছে। তার নিজের সময়টাও তো এভাবেই চলে গেল৷ দেখতে দেখতে ৬ মাস কেটে গেল। টেরই পেল না তপু।

শাহেদ আলি বললেন, “কি হয়েছো? অন্যমনস্ক মনে হচ্ছে!

তপু বলল, “মায়ের কথা মনে পড়ছে।”

” অনেকবার তো বলেছি তোমার মাকে এখানে নিয়ে আসতে। তুমিতো রাজিই হওনি।”

মিথ্যা কিছু বলেননি। তপুকে অনেকবার বলছে এটা। কিন্তু তপু রাজি হয়নি এই কারণে যে, অন্য বাসায় তার মা থাকলে লোকে কি বলবে!

তপু বলল, “আজকে আমি মায়ের কাছে যাব। ওখানে দেখা করে আবার আসব।”

শাহেদ আলি বললেন, “আচ্ছা যাও। তবে তাড়াতাড়ি ফিরে এসো। ২/১ দিনের বেশি দেরি কর না।”

তপু সেই বিকেলেই বাসে তার মায়ের কাছে গেল। একটা শাড়ি কিনেছিল সে মায়ের জন্য। আপাতত টাকা পয়সার কোনো সমস্যা নেই এখন ওর।

মা তাকে দেখে কপালে চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দিল। আর কেঁদে ফেলল।

দুইদিন পর আবার ফিরে এসেছে তপু। মায়ের কাছে কয়েক হাজার টাকা দিয়ে এসেছে সে।

আজ ১ বছর।
তপু এখন পরিচিত তার সততার জন্য। সে একটা বাড়ি বানিয়েছে। এ সবই শাহেদ আলির ব্যবস্থা করে দিয়েছে। তার কথা কোনোদিন ভুলতে পারবে না তপু।একটা মানুষ যে এরকম উদার মনের হতে পারে শাহেদ আলিকে না দেখলে এ জীবনে তপুর অজানাই থেকে যেত।

তপু তার মায়ের সাথে এখন নতুন বাসাতে থাকে। আর তাদের জীবন এখন দুঃখের আঁধার কেটে আলোর মুখ দেখেছে।

কেমন লাগল? ভালো লাগলে, একটা কমেন্ট তো পেতে পারি?

Leave a Reply

Your email address will not be published.