ল্যাপটপ কেনার আগে গুরুত্বপূর্ণ ১০টি বিষয় জেনে নিন

ল্যাপটপ কোনো ৫/১০ টাকার জিনিস না। কারো কাছে এটি একটি স্বপ্ন, আর কারো কাছে এটিই সবকিছু। তাই শখের ল্যাপটপটি কেনার আগে অবশ্যই কিছু বিষয় আপনাকে জেনে নিতে হবে। তা না হলে সব অর্থ-স্বপ্ন জলে যাবে।

ল্যাপটপ বা কম্পিউটার কেনার সময় বেশিরভাগ দোকানদার আপনাকে ঠকাতে চাইবে। ঠকানো বললেও ভুল হবে, মূল কথা হচ্ছে সব দোকানদার নিত্যনতুন ব্রান্ডের ল্যাপটপ সরবরাহ করে না। তাই প্রায় সবাই চাইবে আপনাকে পুরাতন ও লো কোয়ালিটির জিনিস দিতে। বিশেষ করে যারা পিসি বা ডেস্কটপ বিল্ড করেন, তাদের ক্ষেত্রে এটা বেশি দেখা দেয়। কিন্তু যখন আপনি জানবেন যে, কোনটি ভাল আর কোনটি খারাপ তখন আপনাকে কেউ ঠকাতে পারবেনা। আজকের পর্বে আমরা ল্যাপটপ কেনার আগে কি কি বিষয় জেনে নিতে হবে তা সম্পর্কে জানব। আসুন বিস্তারিত শুরু করা যাক।

ল্যাপটপ কেনার আগে মূলত ১০ টি বিষয়ের উপর আপনাকে গুরুত্ব দিতে হবে। নিচে ১০টি বিষয় সম্পর্কে বিস্তারিত বলা হল-

১. কিসের জন্য ল্যাপটপ কিনছেন :

আপনাকে সর্বপ্রথম যে বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে সেটা হচ্ছে, আপনি কিসের জন্য ল্যাপটপ কিনছেন। যদি হয়ে থাকে সাধারণ ব্যবহার বা বিনোদন, তাহলে আপনার জন্য সাধারণ কনফিগারেশনের ল্যাপটপই যথেষ্ট। সে ক্ষেত্রে আপনি ৩৫-৪০ হাজার টাকায় মোটামুটি ভালো মানের একটি ল্যাপটপ কিনতে পারবেন।

অন্যদিকে যদি আপনি ফ্রিল্যান্সিং করে থাকেন তাহলে আপনার দরকার মোটামুটি মধ্যম কোয়ালিটির একটি ল্যাপটপ। সে ক্ষেত্রে আপনার বাজেট মিনিমাম ৫০ হাজার টাকা থাকতে হবে।

এছাড়া যারা গেমিং এর জন্য ল্যাপটপ কিনতে চাচ্ছেন, তাদের জন্য বাজেট আরো বাড়িয়ে ভালো মানের ল্যাপটপ নিতে হবে। সে ক্ষেত্রে আমি গেমারদের জন্য সাজেস্ট করব পিসি নেওয়ার জন্য। কারণ আপনি কম টাকা খুবই ভালো মানের পিসি বিল্ড করতে পারবেন গেমিং এর জন্য।

২. আকার ও ওজন – Shape & Weight :

ল্যাপটপ কেনার পূর্বে, ল্যাপটপটির আকার ও ওজনের দিকটি বিবেচনা করতে হবে। আপনি যদি বেশিরভাগ সময় বাহিরে কাজ করেন, তাহলে আপনাকে কম ওজনের, স্লিম ল্যাপটপ ও স্বাভাবিক সাইজের ডিসপ্লে বিশিষ্ট ল্যাপটপ কিনতে হবে। যারা বাসায় বসে কাজ করবেন, তাদের জন্য বড় সাইজের ডিসপ্লের ল্যাপটপ উপযুক্ত। কিন্তু যারা ল্যাপটপ নিয়ে এদিক সেদিক যাবেন, তাদের জন্য ছোট সাইজের ডিসপ্লেই একদম পারফেক্ট। তাই শখের ল্যাপটপটি কেনার আগে অবশ্যই আপনাকে এসব বিষয়ে ভাবতে হবে। নইলে পরে সমস্যায় পরতে পারেন।

৩. ডিসপ্লের মান – Display Quality :

ল্যাপটপ কেনার ক্ষেত্রে ডিসপ্লে এর গুণ-মান অবশ্যই বিবেচনা করে নিতে হবে। যারা কোডিং করবেন তাদের জন্য ডিসপ্লে রেজুলেশন একটু বেশি হওয়া চাই। আবার অন্যদিকে সাধারণ ব্যবহারের জন্য নরমাল ডিসপ্লের ল্যাপটপই যথেষ্ট। আর ডিসপ্লের কোয়ালিটির উপর ল্যাপটপের দাম কিছুটা কম-বেশি হয়ে থাকে। ল্যাপটপের বিভিন্ন ডিসপ্লের মধ্যে কিছু ডিসপ্লে হচ্ছে HD, FHD, QHD ইত্যাদি।

৪. কীবোর্ড-কীপ্যাড এর ধরণ – Keyboard-Keypad Quality :

ল্যাপটপের কীবোর্ড আর কীপ্যাড যদি ভাল না হয়, তাহলে প্রচুর সমস্যা পোহাতে হয়? কারণ, ল্যাপটপ মূলত ব্যবহার করতে হয় কীবোর্ড আর কীপ্যাড এর মাধ্যমেই। যারা আলাদা কীবোর্ড-মাউস এর কথা ভাবছেন, সেটা ভিন্ন কথা। তাই ল্যাপটপ কেনার আগে আপনাকে কিবোর্ড কিরকম সেটা দেখে নিতে হবে। কারণ বিভিন্ন ল্যাপটপের কিবোর্ড বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। আপনি যেরকম কিবোর্ড-কীপ্যাড এ ব্যবহার স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন, সেটাই কিনবেন।

আর কিবোর্ড এর মধ্যে আবার দুই ধরনের কীবোর্ড আছে। একটি হচ্ছে ব্যাকলাইট কিবোর্ড অন্যটি নন-ব্যাকলাইট কিবোর্ড। ব্যাকলাইট কিবোর্ড লাইট জ্বলবে আর নন-ব্যাকলাইট কীবোর্ডে লাইট জ্বলবে না। এই বিষয়টাও একটু ভেবে-চিন্তে নিবেন।

৫. প্রসেসর – CPU :

ল্যাপটপের আসল জিনিস হচ্ছে প্রসেসর বা সিপিউ। প্রসেসর যদি খারাপ কোয়ালিটির হয়, তাহলে আপনার সম্পূর্ণ টাকা জলে গেল। কারণ ল্যাপটপের স্পিড নির্ভর করে প্রসেসরের উপরে। বর্তমানে Core i9 হচ্ছে সর্বশেষ প্রসেসর। তবে সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য এত বেশি শক্তিশালী প্রসেসর কেনাটা বোকামি। সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য আমি সাজেস্ট করব, ইনটেল এর Core i3 এর প্রসেসর নেওয়ার জন্য। আর যারা টুকটাক ফ্রিল্যান্সিং কাজ করতে চান, তারা Core i5 প্রসেসর বিশিষ্ট ল্যাপটপ নিতে পারেন। আর যারা গেমিং ও ভারী কাজ করতে চান, তাদের জন্য Core i7 বা Core i9 এর প্রসেসর নেওয়াটা বেষ্ট।

কোন প্রসেসর দিয়ে কি কাজ করা যায়? জানতে চান? শীঘ্রই আসছে।

৬. জেনারেশন বা প্রজন্ম – Generation :

প্রসেসর এর সাথে যে জিনিসটি খুবই জরুরী, সেটা হচ্ছে জেনারেশন। যেমন : Core i3 এর 10 Generation হচ্ছে সবচেয়ে ভাল। মূলকথা হচ্ছে যত বেশি জেনারেশন নিবেন, ততই আপনার জন্য ভালো হবে। বর্তমানে সর্বশেষ জেনারেশন হচ্ছে দশম জেনারেশন। আমি আপনাদের সাজেস্ট করবো, নিচে হলেও ৭ম জেনারেশনের উপর ল্যাপটপ নিন। তবে আবারো বলছি, দশম জেনারেশন সবার সেরা।

৭. র‍্যাম – Ram :

প্রসেসরের পর ল্যাপটপের র‍্যাম হচ্ছে একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জিনিস। র‍্যাম যদি কম থাকে তাহলে আপনি ল্যাপটপের স্পিড পাবেন না। শুধু স্পিডই নয়, আপনি মাল্টি-টাস্কও করতে পারবেন না। কমদামী মোবাইল যেমন হ্যাং এর জ্বালায় টিপতে পারেন না, তেমনি ল্যাপটপও কিছুক্ষণ পর পর খালি হ্যাং করবে।

তাই ল্যাপটপ কেনার সময় কমপক্ষে 4GB র‍্যাম এর ল্যাপটপ কিনুন। আর আপনি যদি ফ্রিল্যান্সিং করতে চান তাহলে 8GB র‍্যাম হলে ভালো হয়। তাছাড়া আপনার যদি 8GB র‍্যাম এর ল্যাপটপ কেনার সামর্থ্য না থাকে, তাহলে এমন মডেলের ল্যাপটপ কিনুন যেখানে পরবর্তীতে র‍্যাম লাগানো যাবে।

৮. মেমোরি – HDD & SSD :

ল্যাপটপের তথ্য সংগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে হার্ডডিক্স। আজকাল বেশিরভাগই ল্যাপটপেই 1TB হার্ডডিস্ক পাওয়া যাচ্ছে। তবে আমি আপনাদের বলবো চেষ্টা করবেন হার্ডডিক্স না নিয়ে এসএসডি যুক্ত ল্যাপটপ নেওয়ার। কারণ হার্ডডিক্স এর চেয়ে এসএসডির ক্ষমতা প্রায় ৬ গুণ বেশি। ফলে আপনি যেকোন জিনিস ডাউনলোড অথবা ট্রানস্ফার করতে খুবই কম সময় ব্যয় হবে। অন্যদিকে হার্ডডিক্সে যেকোনো জিনিস ডাউনলোড বা ট্রানস্ফার করতে একটু বেশি সময় নেয়। বলতে গেলে ল্যাপটপের পুরো ডাটা ট্রান্সফার সিস্টেম, অন-অফ সিস্টেম ইত্যাদি নির্ভর করছে হার্ডডিক্স বা এসএসডি এর উপর।

আরেকটি কথা যেটা ন বললেই নয়, আপনার যতটুকু মেমোরি বা হার্ডডিক্স এর প্রয়োজন হবে, সেটুকুই নিবেন। কারণ, হার্ডডিক্স এত বেশি নিয়ে লাভ নেই। এক্ষত্রে ১টিবি হার্ডডিক্স নেওয়ার চেয়ে, ৫১২ জিবি এসএসডি নেওয়া অনেক ভালো।

৯. ব্যাটারি – Battery :

ল্যাপটপ কেনার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ব্যাটারি। আর ব্যাটারি ব্যাকআপ যদি বেশীক্ষণ না থাকে, তাহলে ল্যাপটপ কেনার কোনো মানেই হয়না। তাই আপনাকে ল্যাপটপ কেনার আগে অবশ্যই ল্যাপটপের ব্যাটারি সম্পর্কে জেনে নিতে হবে। সে ক্ষেত্রে আমি আগেও বলেছি ছোট  ডিসপ্লে হলে ব্যাটারি কম খরচ হবে এবং ব্যাকআপ বেশিক্ষন থাকবে। অন্যদিকে বড় ডিসপ্লে হলে একটু শক্তিশালী ব্যাটারি নিতে হবে।

১০. ব্রান্ড – Brand :

ভাল জিনিস পেতে, কখনও কম দামের পিছে ছুটবেন না। শেষে দেখা গেল, আপনি সবকিছুই হারাবেন। বাংলাদেশের অনেক ব্র্যান্ড আছে যারা কম দামে ভালো মানের ল্যাপটপ সরবরাহের কথা বলে থাকে। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা যায় যে কম দামে কিনতে গিয়ে নকল বা খারাপ জিনিস পেয়েছেন।

তাই ল্যাপটপ কেনার আগে অবশ্যই ভালো ব্র্যান্ড দেখে কিনুন। আর নামিদামি ব্র্যান্ডের ল্যাপটপে কোম্পানি থেকে ওয়ারেন্টি থাকে। ফলে ল্যাপটপের কোনোকিছু সমস্যা হলে, আপনি ফ্রিতে ও ভালভাবে সমাধান করতে পারবেন।

অন্যান্য –  Others :

উপরের সবগুলো বিষয় লক্ষ্য করার পরে আপনাকে নজর দিতে হবে, ল্যাপটপটিতে আপনার পছন্দের বৈশিষ্ট্য এবং ফাংশনগুলো ঠিকঠাক আছে কিনা।

এক্ষেত্রে আপনি দেখতে পারেন যে ল্যাপটপে কোনো DVD Writer আছে কিনা। যদিও সম্প্রতি ডিভিডি রাইটার এর কোনো চল নেই, তবে আমার কাছে তা ভালই লাগে। অন্যদিকে আপনি দেখে নিতে পারেন ল্যাপটপে ইউএসবি পোর্ট কয়টি আছে ইত্যাদি।

শেষকথা – Last Moment :

ল্যাপটপ কিনতে হলে যেসব বিষয় জানতে হবে, আশা করি তা আপনি জেনে গিয়েছেন। এছাড়াও আপনার জন্য আমার কিছু পরামর্শ শেয়ার করি।

ল্যাপটপের প্রসেসর এবং র‍্যাম যত বেশি উন্নত হবে, ততো আপনার ল্যাপটপের পারফরমেন্স ভাল হবে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত না নেওয়াই ভালো। এতে আপনার অর্থের অপচয় হবে। অন্যদিকে আপনি যদি গেমিং এর জন্য বা ভারী কাজের জন্য ল্যাপটপ কিনতে চান, তাহলে আমি আপনাকে সাজেস্ট করবো ডেক্সটপ নিন। আর দোকানের রেডিমেড ডেক্সটপ না নিয়ে ডেক্সটপ বিল্ড করে নিন। ডেক্সটপ বিল্ড এর গাইডলাইন আমরা পরের পোস্টে শেয়ার করব ইনশাআল্লাহ।

সেই পর্যন্ত ভাল থাকুন, এর বাইরেও আপনার কোনো প্রশ্ন বা মতামত থাকলে কমেন্ট করে জানাতে পারেন। আর সারাদিন আমাদের ফেসবুক পেজ তো একটিভ থাকছেই…

Leave a Comment

somproti.com

FREE
VIEW